মহাভারত পর্ব ৩: অভিশাপ নাকি আশীর্বাদ?

গত পর্বে আমরা দেখেছিলাম শুক্রাচার্যের কাছ থেকে সঞ্জীবনী মন্ত্রের গুপ্তরহস্য রপ্ত করার জন্য কচ কীভাবে অসুর শিবিরে “অনুপ্রবেশ” করেছিলেন। শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী কচের প্রেমে পড়ে যান, কিন্তু কচ তাঁকে বোন হিসাবে বিবেচনা করেন এবং তাঁর অনুনয়-বিনয় উপেক্ষা করে চলে যান। এখানে থাকছে গল্পের পরবর্তী পর্ব।
 

Mahabharat All Episodes

మహాభారత కథ : శాపాలు, వరాలు

দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা

সদগুরু: দেবযানী, সেই অঞ্চলের অসুররাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। একটি বিশেষ ঘটনা ঘটে, যা একরকমভাবে কুরুবংশের সূত্রপাত। এই দুই তরুণী নদীতে স্নান করতে যান। শর্মিষ্ঠা ছিলেন অসুর- রাজকন্যা আর দেবযানী ছিলেন পুরোহিত শুক্রাচার্যের কন্যা। যার অর্থ তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশজাত, যা সেই সময়ে সামাজিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সবচেয়ে উচ্চশ্রেণীর বলে গণ্য হত। সেই কারণে দুই তরুণী যখন স্নানে গেলেন তাঁরা তাঁদের জামাকাপড়, গয়নাগাটি সব আলাদা করে রাখলেন।

মহাভারতের গোটা কাহিনী জুড়েই রয়েছে অভিশাপ আর আশীর্বাদ। কিন্তু আপনি জানেন না অভিশাপটি আশীর্বাদ নাকি আশীর্বাদটি অভিশাপ, কারণ জীবন তার নিজস্ব উপায়ে সবকিছু মিলিয়ে দিতে পারে।

তাঁরা যখন নদীতে খেলা করছিলেন, একটা দমকা হাওয়ায় জামাকাপড়গুলি উড়ে গিয়ে মিশে যায়। দুই তরুণী যখন নদী থেকে উঠে এলেন, স্বভাবতই পোশাক পরার তাগিদে শর্মিষ্ঠা ভুলবশত দেবযানীর কাপড়ের কিছু অংশ পরে ফেলেন। তখন কিছুটা ঠাট্টা, আবার কিছুটা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেবযানী বললেন, "তুমি কী করে তোমার পিতার গুরুর কন্যার পোশাক পরলে? এ কেমন কথা? এটা কি ঠিক হলো?"

শর্মিষ্ঠা ভুল বুঝতে পারলেন। কিন্তু রাজকন্যা হওয়ায় তিনি রাগে ফেটে পড়লেন এবং বললেন, “তোমার বাবা একজন ভিক্ষুক। উনি আমার পিতার সামনে মাথা নত করেন। আমার পিতার দানেই তোমরা বেঁচে আছো। ভালো হয় যদি তুমি নিজের জায়গাটা বোঝো," এই বলে তিনি তাঁকে একটি গর্তের মধ্যে ঠেলে দেন। দেবযানী গর্তে পড়ে যান। শর্মিষ্ঠা তাঁকে সেখানে ফেলে রেখে তর্জনগর্জন করতে করতে চলে যান।

দেবযানী যখন ঘরে ফিরে এলেন তাঁর বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আপনাকে এই রাজকন্যাকে উচিত শিক্ষা দিতেই হবে।" তাঁর কন্যাকে অপমান করায় শুক্রাচার্য দাবি করলেন রাজকন্যাকে তাঁর মেয়ের দাসী হতে হবে। রাজার কোনো উপায় ছিল না কারণ শুক্রাচার্য ছাড়া আর কে মৃতকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবেন! উনি তো দিশেহারা হয়ে যাবেন।

দেবযানী ইতিমধ্যেই শর্মিষ্ঠার উপর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন এবং তাঁর এটা এখানেই শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল; কিন্তু তিনি ব্যাপারটা আরও কিছুদূর গড়াতে চাইলেন।

মহাভারতের গোটা কাহিনী জুড়েই রয়েছে অভিশাপ আর আশীর্বাদ। কিন্তু আপনি জানেন না অভিশাপটি আশীর্বাদ, নাকি আশীর্বাদটি অভিশাপ, কারণ জীবনের নিজস্ব উপায় রয়েছে নানা জিনিসকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়ার। অভিশাপ হয়ে ওঠে আশীর্বাদ - আবার আশীর্বাদ হয়ে ওঠে অভিশাপ। তো, শর্মিষ্ঠাকে দেবযানীর দাসী হওয়ার অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল। তারপর যযাতির সাথে দেবযানীর বিবাহ স্থির হয়। তিনি জোর করেন যে তাঁর নতুন বাড়ীতে তাঁর খাস দাসী হিসাবে শর্মিষ্ঠাকে যেতে হবে।

দেবযানী ইতিমধ্যেই শর্মিষ্ঠার উপর তাঁর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন আর এটা তাঁর সেখানেই শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল কিন্তু এই বিষয়টা তিনি আরো কিছুদূর গড়াতে চাইলেন। তাই‌ বিয়ের পর শর্মিষ্ঠা তাঁর দাসী হিসাবে তাঁর সঙ্গে আসেন। যযাতি ও দেবযানী স্বামী-স্ত্রী হিসাবে একসাথে বসবাস করছিলেন ও যদু নামক তাঁদের একটি পুত্র ছিল। যাদবরা এই যদুকুল থেকেই এসেছেন।

শর্মিষ্ঠা দেবযানীর দাসী হলেও একজন রাজকন্যা হওয়াতে তিনি এক বিশেষ মর্যাদার সাথে থাকতেন। এমনকি তিনি নিজেকে দেবযানীর চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন। অবধারিতভাবে যযাতি তাঁর প্রেমে পড়েন। একটি গোপন প্রণয়-সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তাঁদের একটি সন্তান হয়। সেই শিশুই হল পুরু, যিনি কুরু রাজবংশের একজন পূর্বপুরুষ ছিলেন।

শুক্রাচার্য যখন বুঝতে পারেন যে যযাতি তাঁর কন্যার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং দাসীর সাথে তাঁর এক সন্তান হয়েছে, তিনি তাঁকে অভিশাপ দেন: "তুমি যেন তোমার যৌবন হারাও"।তখন যযাতি এক বৃদ্ধে পরিণত হন।

যযাতির প্রথম সন্তান হওয়ার সুবাদে স্বভাবতই যদুর রাজা হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এক সামান্য অপরাধের কারণে তিনি তা হননি। শুক্রাচার্য যখন বুঝতে পারেন যে যযাতি তাঁর কন্যার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং দাসীর সাথে তাঁর এক সন্তান হয়েছে, তিনি তাঁকে অভিশাপ দেন : "তুমি যেন তোমার যৌবন হারাও"। তখন যযাতি এক বৃদ্ধে পরিণত হন।

তিনি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। যদু যখন বড় হয়ে এক সুন্দর যুবক হয়ে ওঠেন, যযাতি তাঁকে বলেন, “তোমার যৌবন আমায় দাও এবং কয়েক বছর আমাকে এটা উপভোগ করতে দাও। তারপর তোমার যৌবন আমি তোমায় ফিরিয়ে দেব।" যদু বলেন,"একেবারেই না। প্রথমত আপনি আমার মাকে প্রতারণা করেছেন। এখন আপনি আমার যৌবন কেড়ে নিতে চান। তা হবে না।” তখন যযাতি যদুকে অভিশাপ দেন: "তুমি যেন কখনও রাজা হতে না পারো।"

যযাতির দ্বিতীয় পুত্র পুরু, যিনি শর্মিষ্ঠার কোলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন- স্বেচ্ছায় নিজের যৌবন তাঁর পিতাকে অর্পণ করেন; এই বলে যে, “পিতা, আপনি এই যৌবন উপভোগ করুন। আমার কাছে এর কোনো মূল্য নেই।" যযাতি আবার তারুণ্যে ভরপুর হয়ে ওঠেন এবং যুবকরূপে কিছুকাল বাঁচেন। যখন তাঁর মনে হল যে আশ মিটেছে, তিনি তাঁর পুত্র পুরুকে যৌবন ফিরিয়ে দিলেন এবং তাঁকে রাজা করলেন।

চলবে...

More Mahabharat Stories

Editor’s Note: A version of this article was originally published in Isha Forest Flower June 2015. Download as PDF on a “name your price, no minimum” basis or subscribe to the print version.