মহাভারত পর্ব ৮: অম্বার দুর্দশা

শান্তনুর সত্যবতীকে বিয়ে করার পর থেকে সদগুরু গল্পটি বলা শুরু করছেন এবং কুরুবংশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টায় ভীষ্ম কীভাবে এক দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন - সেই দিকে দৃষ্টিপাত করছেন।
Mahabharat Episode 8: Amba’s Plight
 

Mahabharat All Episodes

সদগুরু: কাজেই শান্তনু তাঁর ছেলের জীবন কেড়ে নিলেন, ঠিক যেমন করে যযাতি তাঁর পুত্রের যৌবন চেয়েছিলেন। সত্যবতীর সাথে শান্তনুর দুটি সন্তান হয়। প্রথমজন চিত্রাঙ্গদ নামে আর দ্বিতীয়জন বিচিত্রবীর্য নামে পরিচিত ছিলেন। উদ্ধত নবযুবক চিত্রাঙ্গদ একদিন অরণ্যে যান। তিনি এক গন্ধর্বের মুখোমুখি হন - গন্ধর্ব হলো বিস্ময়কর দক্ষতার অধিকারী এক সত্তা, যিনি অন্য কোথাও থেকে এসেছিলেন - তাঁর নামও ছিল চিত্রাঙ্গদ। এই গন্ধর্ব যখন বালকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, "কে তুমি?," গর্বের সাথে তিনি জবাব দিলেন, "আমি চিত্রাঙ্গদ।" গন্ধর্ব হেসে বললেন, "তোমার কত বড়ো সাহস যে তুমি নিজেকে চিত্রাঙ্গদ বলো? আমি চিত্রাঙ্গদ। ভালো চাও তো নিজের নাম পরিবর্তন করো। এটা আমার নাম। তুমি আমার নাম ধারণের যোগ্য নও।" তরুণ রাজকুমার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "তোমার কত বড়ো সাহস যে তুমি একথা বলো! দেখে মনে হচ্ছে তোমার অনেককাল বাঁচা হয়ে গেছে। এসো আমরা যুদ্ধ করি কারণ আমার পিতা আমার নাম রেখেছেন চিত্রাঙ্গদ, আর এটাই আমার নাম।" তাঁরা যুদ্ধ করলো আর নিমেষের মধ্যেই বালকটি মারা গেল।

বিচিত্র পুরুষ

এখন মাত্র একজন পুত্রই বেঁচে থাকলো - বিচিত্রবীর্য। "বিচিত্র" মানে অদ্ভুত বা বিকৃত, "বীর্য" মানে পুরুষত্ব। তিনি অদ্ভুত বা বিকৃত পৌরুষের অধিকারী ছিলেন। এর মানে ঠিক কী আমরা জানি না। হয় তিনি স্ত্রীলাভ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন অথবা তিনি স্ত্রীলাভের অযোগ্য ছিলেন। স্ত্রীলাভ বা সন্তানলাভের বিষয়টা আমাদের আজকালকার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা ঠিক নয়। সেই সময় এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল; কারণ একজন রাজা হিসেবে প্রথম চিন্তা হল পুত্রাদি অবশ্যই থাকতে হবে। নইলে পরবর্তী বংশধর কে হবে? প্রতিদিন তাঁরা যুদ্ধে যাচ্ছেন। আপনি যেই হন না কেন, আপনি মারা পড়তে পারেন। আপনি যদি মারা যান, আপনার কোনও পুত্র সন্তান আছে কিনা- সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। সেইজন্যই তাঁরা সবসময় স্ত্রীলাভ করে পুত্র লাভের চিন্তা করতেন কারণ আপনার যদি কোনো পুত্র না থাকে, গোটা সাম্রাজ্যই হাতের বাইরে চলে যাবে।

বিচিত্রবীর্য স্ত্রীলাভে ইচ্ছুক নন। ভীষ্মও পত্নী লাভে অনিচ্ছুক। চিত্রাঙ্গদ মৃত। সুতরাং কুরু সাম্রাজ্য এক অচল অবস্থায় দাঁড়িয়ে।

বিচিত্রবীর্য স্ত্রীলাভে ইচ্ছুক নন। ভীষ্মও পত্নী লাভে অনিচ্ছুক। চিত্রাঙ্গদ মৃত। সুতরাং কুরু সাম্রাজ্য এক অচল অবস্থায় দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতিতে কাশীর রাজা তাঁর তিন কন্যার স্বয়ম্বর ঘোষণা করলেন - আর কুরুবংশকে তাঁরা কোনও নিমন্ত্রণপত্র পাঠালেন না। ওই অঞ্চলে কুরু রাজবংশই ছিল সবচেয়ে বড়ো এবং সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কিন্তু তাঁরাই কোনো আমন্ত্রণ পেলেন না; কারণ কাশীর রাজা চাইতেন না যে - যার পৌরুষ নিয়ে গুজব শোনা যায়, সেই বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে তাঁর কন্যাদের বিবাহ হোক। এইরকম মুখের ওপর অপমান ভীষ্ম সহ্য করতে পারলেন না কারণ কুরু সাম্রাজ্যের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিলো তাঁর নিজের বা অন্য কারোর ভালো-থাকার উর্ধ্বে। তাই তিনি স্বয়ম্বরে উপস্থিত হবেন বলে মনস্থির করলেন।

ভীষ্ম অম্বাকে অপহরণ করেন

স্বয়ম্বর মানে একজন তরুনী তাঁর নিজের ভাগ্য বেছে নিতে পারতেন। যখন কোনো রাজকন্যা বিবাহযোগ্যা হতেন, তাঁরা এক ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন যেখানে ক্ষত্রিয় বংশের যে কেউ, যাঁরা নিজেদের উপযুক্ত বলে মনে করতেন তাঁরা অংশ নিতে পারতেন এবং নারী তাঁর স্বামী নির্বাচন করতে পারতেন। এটা ছিল তাঁর পছন্দ। অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না।

কাশীরাজের তিন কন্যা - অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকা - একইসাথে স্বয়ম্বরে এলেন। অম্বা ইতিমধ্যেই শল্বরাজের প্রেমে পড়েছিলেন যাঁর নাম ছিল শল্য এবং তিনি তাঁকেই বেছে নেবেন। নিজের পছন্দ ব্যক্ত করার খুব সহজ উপায় ছিল যে মেয়েটিকে একটি মালা দেওয়া হতো আর তিনি চারপাশে সব পুরুষদের দিকে দেখতেন আর যখন কাউকে পছন্দ করতেন, তাঁকে মাল্যদান করতেন আর তিনিই তাঁর স্বামী হতেন। অম্বা শল্যের কাছে গিয়ে তাঁকে মাল্যদান করলেন।

বিচিত্রবীর্য শুধু অম্বিকা ও অম্বালিকাকেই বিবাহ করলেন। অম্বাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন।

ঠিক তক্ষুনি, ভীষ্ম প্রবেশ করলেন। সেখানে উপস্থিত অন্য যোদ্ধারা তাঁকে ভয় পেতেন কারণ তিনি এক মহান যোদ্ধা ছিলেন। তার সাথে তাঁরা এটাও জানতেন যে তিনি নিজের মুষ্কচ্ছেদ করেছেন এবং তিনি কখনই বিবাহ করবেন না। তাই তাঁরা তাঁকে বিদ্রুপ করতে লাগলেন, "এই বৃদ্ধ লোকটি আবার এখানে কেন এসেছেন? উনি কি বিয়ের জন্য কনে খুঁজছেন? নাকি কুরুবংশে আর কোনও যোদ্ধা নেই যে এসে বিয়ের পাত্রী নিয়ে যেতে পারে? সেই জন্যই কি তিনি এসেছেন?" তাঁর জাতি-বংশকে নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে দেখে ভীষ্ম রেগে আগুন হয়ে গেলেন। তখন তিনি তিনজন কন্যাকেই অপহরণ করে তাঁদের নিজের সঙ্গে নিয়ে এলেন। অন্য সকল যোদ্ধারা যুদ্ধ ঘোষণা করলেন কিন্তু তিনি সবাইকে পরাজিত করলেন। শল্য নিজেও যুদ্ধ করলেন কারণ তাঁর বিয়ের কনেকে হরণ করা হচ্ছিল কিন্তু ভীষ্ম তাঁকে পরাস্ত করে অপদস্থ করেন এবং তিন কন্যার সবাইকেই নিয়ে চলে যান।

পূর্ববর্তী প্রজন্মে, যেখানে একজন নারী শর্ত আরোপ করতে পারতেন- সেই জায়গা থেকে এটি একটি পরিবর্তন। এখন নারীকে দখল করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অম্বার চোখে অশ্রু। যখন তাঁরা কুরুদের রাজধানী হস্তিনাপুরের দিকে যাচ্ছিলেন- অম্বা বললেন, "আপনি এটা কি করলেন? আমি ওই মানুষটিকে ভালোবেসেছিলাম এবং আমি ইতিমধ্যেই তাঁকে মাল্যদান করেছি। উনিই আমার স্বামী। আপনি আমাকে এইভাবে নিয়ে যেতে পারেন না।"

ভীষ্ম উত্তর দিলেন, "আমি তোমাকে অর্জন করেছি। আমি যা অর্জন করি তা কুরুবংশের অধীন।" তখন অম্বা ভীষ্মকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি কি আমাকে বিবাহ করবেন?" ভীষ্ম বললেন, "না, তুমি বিচিত্রবীর্যকে বিবাহ করবে।" কিন্তু বিচিত্রবীর্য শুধু অম্বিকা ও অম্বালিকাকে বিবাহ করলেন। অম্বাকে তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করলেন যে, "উনি অন্য একজনকে মাল্যদান করেছেন। উনি অন্য কাউকে হৃদয় দিয়েছেন। আমি এই নারীকে বিবাহ করব না।"

অম্বার দুর্দশা

অম্বা একেবারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন, "এখন আমার কী করণীয়?" ভীষ্ম তাঁর কাছে অপরাধ স্বীকার করে বললেন, "আমি আপনাকে শল্যের কাছে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবো।" এই ব্যবস্থায় অম্বা বেশ খুশিই হলেন এবং শল্যের কাছে ফিরে গেলেন - কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি খুব বড়ো এক ধাক্কা খেলেন। শল্য তাঁকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করলেন যে, "আমি এখানে কারোর দান নিতে বসে নেই। আমি যুদ্ধে হেরে গেছি। ঐ বৃদ্ধ বর্বরটি আমায় পরাজিত করে এখন কিনা পাত্রী ভিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি তোমাকে গ্রহণ করব না। ফিরে যাও।"

এটা ৫০০০ বছর আগেকার কথা, একজন রাজকন্যা সব জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত, তিনি তাঁর পিতার কাছেও ফিরে যেতে পারেন না, তাঁর কোনো স্বামী নেই। তাঁর ভালোবাসার মানুষ তাঁকে ফিরিয়ে নিচ্ছেন না।

অম্বা এখন দুই জায়গাতেই প্রত্যাখ্যাত হলেন। তিনি হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন এবং চেষ্টা করলেন যাতে ভীষ্ম তাঁকে বিবাহ করেন, "আপনি আমার জীবন নষ্ট করেছেন। আমি যে মানুষটিকে ভালোবাসি তাঁকে আপনি কেড়ে নিয়েছেন, আপনি জোর করে আমায় এখানে নিয়ে এসেছেন এবং যে মানুষটিকে আমার বিয়ে করার কথা - উনি আমাকে বিয়ে করবেন না। আপনিই আমাকে বিবাহ করুন।" কিন্তু ভীষ্ম অস্বীকার করলেন। "আমার আনুগত্য আমার দেশের প্রতি। আমি কথা দিয়েছি যে আমি বিবাহ করবো না আর সেটাই শেষ কথা।"

সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে অম্বা বেরিয়ে গেলেন। কল্পনা করুন যে এটা ৫০০০ বছর আগেকার কথা, একজন রাজকন্যা সব জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত, তিনি তাঁর পিতার কাছে ফিরে যেতে পারছেন না, তাঁর কোনো স্বামী নেই। তাঁর ভালোবাসার মানুষ তাঁকে ফিরিয়ে নিচ্ছেন না। কোথায় যাচ্ছেন তা না জেনেই তিনি বেরিয়ে পড়লেন, একেবারে নিঃসঙ্গ অবস্থায়।

চলবে...

More Mahabharat Stories

Editor’s Note: A version of this article was originally published in Isha Forest Flower August 2015. Download as PDF on a “name your price, no minimum” basis or subscribe to the print version.