কর্মের নথি

এক অন্বেষী সদগুরুকে প্রশ্ন করেন, কর্মফল যখন নানাভাবে, ক্রমাগত রেকর্ড হয়ে চলেছে, তবে কি এটা মানুষকে কষ্টের মধ্যে রাখার একটা বিস্তৃত ফাঁদ নয়? সদ্গুরু ব্যাখ্যা করলেন, যখন কেউ কোনো বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, বরং স্বেচ্ছায় জীবনযাপন করেন, তখন কর্মফল আপনার যাই হোক না কেন, জীবনটা আপনি কিভাবে চালনা করবেন, তা ১০০% আপনারই হাতে।
কর্মের নথি
 

প্র: সদগুরু, আগের দিন আপনি যখন কর্মফল নিয়ে কথা বলছিলেন, আপনি বলেছিলেন একজন মানুষের মধ্যে তার কর্মফল রেকর্ড করার জন্য জীবনের অনেক পদ্ধতি বানিয়ে রেখেছে: মন, দেহ, আর এমন কি শক্তির মাধ্যমেও হয়। যদি স্মৃতি নাও থাকে, তবে তা দেহ বা শক্তির ভেতরে থেকে যায়। এটা শুনে মনে হয় এ যেন সবকিছুকে কষ্টের মধ্যে রাখার একটা বিস্তৃত এবং দুষ্ট উপায়। এমন কেন?  

সদগুরু: দেখো, যখনই আমি কোন কথা বলি, আমার কর্মফল রেকর্ড করার জন্য তিনটে রেকর্ডার থাকে, যাতে আমি কখনই আমার কথার খেলাপ না করি এ হল তারই একটা দুষ্ট পরিকল্পনা। কোন অসতর্ক মুহূর্তে আমি যদি একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েও ফেলি, তাহলে তিনটে রেকর্ডিং আছে যাতে আমি সেটার অন্যথা না করতে পারি।
 
এখন আপনি যেমনভাবে বুঝছেন, কর্মফল ঠিক তেমন নয়। এর মধ্যে দুষ্টতার কিছু নেই। আপনার বর্তমান অবস্থা আপনার কর্মের ফল ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনার জন্মের মুহূর্ত থেকে এখনকার এই মুহূর্ত অবধি, আপনি যা করেছেন, ভেবেছেন আর অনুভব করেছেন, সেটাই আপনার কর্মফল। এখন আপনি যা কিছু, আপনার কর্মফলই তা তৈরী করেছে। এটা আপনাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। সুতরাং কর্মফল কোনো দুষ্ট পরিকল্পনা নয়। হ্যাঁ, কর্মফল একধরণের বন্ধন, কিন্তু কর্মফল সুরক্ষাও দেয়। এর উপরেই ভিত্তি করে আপনার শারীরিক সত্তা রয়েছে। যদি কর্মফল বলে কোন বস্তু না থাকে, তবে কোন ভাবেই আপনাকে এই দেহে আবদ্ধ করে রাখা যাবে না। যদি সব কর্মফল সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে এই মুহূর্তে আপনি দেহত্যাগ করবেন। তাই, সব রেকর্ড হচ্ছে এটাই নিশ্চিত করার জন্য যে, আপনার দৈহিক, আপনার মানসিক, আপনার চৈতন্য, এবং আপনার শক্তির স্তরে, কোনকিছুই যেন কখনও হারিয়ে না যায়।
 
আপনার সবচেয়ে সহজাত প্রবৃত্তি হল আত্ম-সংরক্ষণ। নিজেকে সংরক্ষণ করার জন্য, আপনি আপনার চারপাশে একটা দেওয়াল গড়েছেন, আর কিছু সময়কাল ধরে আপনি এই দেওয়ালের সুরক্ষা উপভোগ করেছেন। কিন্তু আপনারই অন্য এক অংশের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সীমাহীনভাবে বিকশিত হওয়া। এখন, আপনার ভিতরকার সেই সত্তাটা আপনাকে সহসা বলতে শুরু করেছে যে এই দেওয়ালটা একটা কারাগার। সে চায় এই দেওয়াল ভেঙে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু আবার আপনার ভিতরকার অন্য অংশটা, যা আত্ম-সংরক্ষণের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তা চাইছে এই দেওয়ালটাকে আরও মজবুত করতে। তা চাইছে দেওয়ালটা আরও বেশি পুরু হোক। আপনি যদি একটা মানুষকে দেখেন, চার্লস ডারউইন-এর কথামত, আপনার ইতিহাস হল পাশবিক প্রকৃতির; কিন্তু তবুও আপনার মধ্যে কিছু একটা আছে যা সর্বদা বিকশিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা রাখে। আপনি যদি সেই আকাঙ্ক্ষাটাকে দেখেন, এর কোন অন্ত নেই। এটা ততক্ষন সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না এটা অসীম হচ্ছে।  

কর্মফলের অট্টালিকা

আপনার ইতিহাস পাশবিক। আপনার ভবিষ্যৎ দৈব। এখন আপনি একটা পেন্ডুলাম-এর মত এই দুইয়ের মাঝখানে দুলছেন। আপনার এক অংশ, আপনার ভেতরকার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃত্তি, হল আত্ম-সংরক্ষণ। আপনার অন্য এক অংশের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সব বন্ধন ভেঙে ফেলা। কর্মফল হল আত্ম-সংরক্ষণের দেওয়াল। আপনি অনেক যত্ন নিয়ে এক সময় সেটা তৈরি করেছেন, কিন্তু এখন তার মধ্যে নিজেকে বন্দি মনে হচ্ছে। কর্মফল হল নিজেকে কারারুদ্ধ করার অট্টালিকা। যেটা না চান আপনি রাখতে, না পারবেন আপনি ফেলতে। এটাই সমস্যা। তো, আপনি এখন চেষ্টা করছেন আপনার কারাগারের আয়তন বাড়াতে, কিন্তু ধরুন আমরা যদি আপনাকে একটা ৫X৫ আয়তনের ছোট্ট ঘরে বন্ধ করে রাখলাম। আমরা সেখানে আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, আপনাকে সম্পূর্ণভাবে বন্দি করে রাখি - তখন আপনি স্বাধীন হওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠবেন। আপনার কাছে তখন স্বাধীনতা মানে হবে আশ্রমের চৌহদ্দি, বা বেড়াটা। আমরা যদি আপনাকে ছেড়ে দিই, সেটা আপনার কাছে বিশাল স্বাধীনতা মনে হবে, কিন্তু দিন-তিনেকের মধ্যেই আপনি গিরি-পর্বতের দিকে তাকাবেন, আকাশের দিকে তাকাবেন, প্রবেশদ্বারের দিকে তাকাবেন, আর আপনার কাছে স্বাধীনতা মানে তখন আশ্রমের প্রবেশদ্বার থেকে সম্প্রসারিত হয়ে অন্য কিছু হয়ে যাবে। আমরা বলব, আচ্ছা আপনি থানিকান্দি (আশ্রমের কাছেই একটি জায়গা) অবধি গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। কিছুদিনের জন্য সেটা একটা দারুন স্বাধীনতা বলে মনে হবে, কিন্তু তারপর আপনি কোয়েম্বাটুর যেতে চাইবেন। যদি পর্যাপ্ত পরিমানে কোয়েম্বাটুর যাত্রা করেন, তখন আপনার মনে হবে কোয়েম্বাটুরও যথেষ্ট নয়। আপনাদের মধ্যে যারা ঐতিহ্যগত আধ্যাত্মিকতায় খুব প্রভাবিত, তারা চাইবেন হিমালয়ে যেতে। আর নয়তো চাইবেন আরও বড় কোনো শহরে যেতে, বা সেইরকম কিছু একটা। তাই আপনার কারাবাসের ধারণা ক্রমাগতই বদলাচ্ছে। আপনার স্বাধীনতার ধারণাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।  
 
একটা পুরো জীবনকাল ব্যয় করে, প্রতিটা পদে পদে জীবনকে বোঝার চেষ্টা করে, শেষে একজন মূর্খের মত মৃত্যুবরণ করা কেন? এটাই সময় এই বিষয়টা দেখার। আপনার কাছে স্বাধীনতা মানে সীমাহীনতা। আপনার সত্তা সীমাহীনতার থেকে কম কিছুকে মেনেই নেবে না। আপনি যদি নিজেকে দেখেন এটা আরও পরিষ্কার হবে। আপনি যদি অসীম হতে চান, শারীরিক বন্ধন ভেঙে আপনি অসীমতা পেতে পারবেন না, কারণ শারীরিক সত্তা কখনও অসীম হতে পারবে না। শুধুমাত্র আপনি যদি শারীরিক বাস্তবের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারেন, আপনি যদি শারীরিক অস্তিত্বেরই ঊর্ধ্বে যেতে পারেন, তবেই সীমাহীনতা একটা সম্ভাবনা হবে।  

স্বেচ্ছায় জীবনযাপন

কর্মফল সেটাই যার ওপর ভিত্তি করে আপনার দৈহিক অস্তিত্ব বজায় রয়েছে। এছাড়া শরীরের সঙ্গে নিবদ্ধ থাকার আর কোনো উপায় নেই। তাই প্রকৃতি বা সৃষ্টিকর্তা এটা নিশ্চিত করতে চান যে আপনার কাজ করার একটা ভিত্তি রয়েছে। দেহ ছাড়া অন্বেষণ করা সম্ভব নয়। একটা অশরীরী সত্তা স্বেচ্ছায় অন্বেষণ করতে পারে না। যদি সে একটা নির্দিষ্ট স্তরে উন্নীত না হয়ে থাকে, একজন অশরীরী সত্তা কেবলমাত্র প্রবৃত্তির মাধ্যমে অন্বেষণ করতে পারে, স্বেচ্ছায় কখনই নয়।  

আপনি অচেতনভাবে বিছানায় গড়াগড়ি করতে পারেন, কিন্তু আপনি অচেতনভাবে সকালের যোগাসন করতে পারবেন না।

 
ব্রহ্মচাৰ্য বা সন্ন্যাসের অর্থ হল আপনি স্বেচ্ছায় এই জীবনযাপন করছেন। এখন এই নির্বাচনের প্রক্রিয়াটাকে একটা জীবন্ত সত্যে পরিণত করার জন্য, আমরা যোগের মাধ্যমে নানা উপায় বার করেছি। সকালবেলায়, আপনি বিছানায় গড়াগড়ি করতে পছন্দ করেন। সেটা দেহের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, কিন্তু এখন আপনি সকালে যোগাসন করতে পারেন। আপনি অচেতনভাবে বিছানায় গড়াগড়ি করতে পারেন, কিন্তু আপনি অচেতনভাবে সকালের যোগাসন করতে পারবেন না। স্বাভাবিকভাবেই দৈহিক গতিবিধির এই পুরো প্রক্রিয়াটা সচেতনভাবে ঘটবে। আপনাকে আপনার জীবনে এই ধরণের কার্যকলাপ নিয়ে আসতে হবে - সচেতন চিন্তা, সচেতন আবেগ, সচেতন ভাবে বেঁচে থাকা। পুরো জীবনীশক্তিই সচেতন হয়ে উঠবে কারণ কেবলমাত্র আপনি যদি সচেতন হন, আপনার জীবন সচেতন ভাবে ঘটবে। তা নাহলে আপনার জীবন বাধ্যতামূলকভাবে ঘটবে। এই মুহূর্তে স্বাধীনতা আর বন্ধনের পার্থক্য হচ্ছে, আপনি নয় বাধ্যতামূলক ভাবে কাজ করছেন, না হয় স্বেচ্ছায়।  
 
মানুষের বিভিন্ন ধরণের কর্ম হয়। তার ফল সর্বদা আছে, কিন্তু সেটা আপনি প্রত্যেক মুহূর্তে কিভাবে কাজে লাগাবেন, তা সবসময়ই আপনার ব্যাপার - এটা আপনার হাতে। আপনার কি ধরণের পূর্ব কর্মফল রয়েছে সেটা কোন ব্যাপার নয় - এই মুহূর্তের কর্মফল কিন্তু সবসময়ই আপনার হাতে। এই মুহূর্তে আপনি আনন্দময় হবেন, না অবসাদগ্রস্ত হবেন, তা একশ শতাংশ আপনার ইচ্ছের ওপর নির্ভর করছে, যদি আপনি সে ব্যাপারে সচেতন হতে ইচ্ছুক হন। তাই, কর্মফল রেকর্ড হচ্ছে, না আপনি তিন ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার করে আমাকে রেকর্ড করছেন সেটা কোনো সমস্যাই নয় কারণ আমি কখনও আমার কথার নড়চড় করবো না। সুতরাং আমার সমস্যাটা কি? ইচ্ছে হলে ৩০০টা রেকর্ডার ব্যবহার করুন। আপনি একই জিনিস রেকর্ড করবেন। প্রকৃতি লক্ষ-লক্ষ ভাবে রেকর্ড করছে। আপনার সমস্যা কোথায়? আপনি শুধু এগিয়েই যেতে পারবেন। আপনি পিছিয়ে যেতে পারবেন না। সুতরাং রেকর্ড করতে দিন। দেবদূত, শয়তান, আর বাকি সবাই রেকর্ড করুক। গাছপালা, পশুপাখি, আর কীটপতঙ্গ রেকর্ড করুক আপনার কর্মফল। আপনার সমস্যা কোথায়?

 
 
 
 
  0 Comments
 
 
Login / to join the conversation1