১# অদক্ষ উপায়ে চাষাবাদ

সদগুরু: ভারতবর্ষে, ৫০ শতাংশেরও বেশী জমি চাষের জন্য ব্যাবহার করা হয়। যার অর্থ আমরা প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি জমি কর্ষণ করি। কিন্তু যদি আমরা চাষ আবাদে আরও বেশি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে আসি, মাত্র তিরিশ শতাংশ জমিই সমগ্র ভারতবাসীর খাদ্যের যোগান দিতে পারবে। এখনও আমরা যে পদ্ধতিতে চাষ করে থাকি, বিগত হাজার বছরেও তার পরিবর্তন হয়নি - এটি খুব অদক্ষ উপায়ে করা হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ, ভারতে এককেজি চাল উৎপাদন করতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লিটার এরও বেশি জল প্রয়োজন হয়, চিনে প্রায় তার অর্ধেক পরিমাণ জলেই হয়ে যায়। এবং তাদের উৎপাদন ক্ষমতাও আমাদের থেকে দ্বিগুন। আমাদের চাষ আবাদে আধুনিক বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা প্রয়োজন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রচুর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা বসে আছে। কিন্তু এসব জমি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।

3-reasons-for-indias-water-crisis-farmer-with-plough-in-the-field

র‍্যালি ফর রিভারস চলাকালীন আমরা তিনজন ভিয়েতনামি বিশেষজ্ঞকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম কারণ ভিয়েতনাম এখন বিশ্বের এক বৃহৎ ফল রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠেছে। যখন আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তারা আমাদের দেখে হেসে উঠেছিল! তারা বলল, “22 বছর আগে আমরা তিনজনেই দিল্লীর কৃষি কলেজে পড়তাম, আমরা সমস্ত কিছু এখান থেকে শিখে আমাদের জমিতে প্রয়োগ করেছি। আপনাদের এত জ্ঞান নিয়ে আপনারা শুধু কাগজে লেখালেখি করেন আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলচনা করেন, কিন্তু আপনাদের জমিতে প্রয়োগ করছেন না। এটাই আপনাদের সব থেকে বড় সমস্যা।

তার জন্যই আমরা তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কোয়েম্বাটুরের ফরেস্ট কলেজের সাথে কাজ করছি। আমরা এটা দেখতে চাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যে বিজ্ঞান এত সহজলভ্য তাকে কিভাবে জমিতে প্রয়োগ করা যায়।

#২ বৃক্ষের ঘনত্ব কমে যাওয়া

3-reasons-for-indias-water-crisis-farmer-with-cattle

40 বছর আগে, যখন আমি এক খামারবাড়িতে বসবাস করতাম, এটা তখন খুব স্বাভাবিক ছিল যে প্রত্যেক কৃষকই নিজের জমিতে কিছু গাছ রাখতেন। এটা ছিল তার বীমা।

এই সংস্কৃতিটি কর্নাটকে খুব বেশি মাত্রায় চলত । তারা সেই গাছগুলির নাম রাখতেন নিজেদের ছেলেমেয়ের নামে। যখন মেয়ের বিয়ের সময় আসতো তখন সেই গাছটিকে কাটলেই সেই বিবাহের ব্যবস্থা হয়ে যেত। যদি তার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে চাইতো আরও একটা গাছ কাটা হত আর পুরো ব্যাপারটার সুরাহা হয়ে যেত।

সবসময় কিছু গাছ চাষের জমিতে থাকতো। কিন্তু চল্লিশ বছর আগে রাসায়নিক সার উৎপাদনকারী সংস্থাগুলি ভারতবর্ষের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে এই বলে প্রচার করতে লাগল, যে যদি আপনাদের কৃষিজমিতে বড় গাছ থাকে তার শিকড়বাকড় সব সার খেয়ে নেবে। এবং তারা চাষিদের গাছগুলি কেটে ফেলতে বললো। সেই সময় আমরা চাষের জমিতে লক্ষ লক্ষ গাছ কেটে ফেললাম, কারন আমরা ভেবেছিলাম সব রাসায়নিক সার এই গাছের পিছনেই নষ্ট হয়ে যাবে।

আজ আমরা এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি যে প্রত্যেকটি জলের উৎস- যেমন মাটির তলার জল এবং নদীর জল, সবই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এটা হচ্ছে কারণ যদিও বিগত ১00 বছর ধরে এই উপমহাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় একই রয়েছে, আমাদের মাটির জল ধারণ করার ক্ষমতা কমে গেছে। তার কারণ সবুজের ঘনত্ব কমে আসছে। যখন বৃষ্টি আসে, জল বয়ে যায় এবং বন্যা দেখা দেয়। যখন বর্ষা শেষ হয়ে যায়, আমরা খরা পাই।

আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে এই জল যেন খুব দ্রুত নদীতে গিয়ে না পড়ে। এটা করার একমাত্র উপায় হল আরও বেশি পরিমাণ গাছপালা। এটা কোন জটিল বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র, কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলি সমেত সমগ্র পৃথিবীতে এটাই আমার প্রধান লক্ষ্য । বাঁধ, চেক ড্যাম, ব্যারেজ এসব ব্যবহারের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু এগুলি দিয়ে জলের পরিমাণ বাড়ানো যাবে না। সত্যিই যদি জল ধরে রাখতে হয় তার একমাত্র উপায় হল গাছপালা।

এর জন্যই আমরা কাবেরী কলি্ং অভিযান শুরু করেছি। কৃষি জমিতে এগ্রোফরেস্ট্রির বৃক্ষ বনায়নের মাধ্যমে ২৪২ কোটি গাছ লাগাতে কৃষকদের সহায়তা করা আমাদের লক্ষ্য। কাবেরী তার প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। আমরা যদি ১২ বছরের মধ্যে কাবেরী অববাহিকায় এটার সাফল্য দেখাতে পারি, এই দেশের এবং সমস্ত গ্রীষ্মপ্রধানদেশের পাশা পাল্টে দেওয়ার মত ব্যাপার হবে।

#৩ জনসংখ্যা বৃদ্ধি

3-reasons-for-indias-water-crisis-family-of-6-in-two-wheeler

 

পরিবেশ, জল কিম্বা অন্যান্য যে সমস্যাগুলির সম্মুখীন হচ্ছি আমরা, তার একটি কারণ হল মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন বংশবৃদ্ধি। ভারতবর্ষ দেশটিতে ১.৩ বিলিয়ন মানুষ রয়েছে। আমাদের এই ১.৩ বিলিয়ন মানুষের জন্য না পর্যাপ্ত জমি, নদী, পর্বতমালা আছে, না আছে এক টুকরো আকাশ।

ভারতের প্রবল জল সমস্যার দিকে যদি নজর দেন দেখবেন, ভারতে এখন মাথাপিছু জলের পরিমান যা, তা ১৯৪৭ সালে যা ছিল তার মাত্র ২৫%। এটি উন্নয়ন নয়। তামিলনাড়ুর অনেক শহরে ইতিমধ্যেই এমন ঘটছে যে লোকেরা তিন দিনে কেবল মাত্র একবারই স্নান করতে পারেন।

এটি এমন একটি সংস্কৃতি ছিল যেখানে যাই ঘটুক না কেন, এমনকি আপনি যদি না খেয়েও থাকেন, স্নান অবশ্যই করতেন। আমাদের আবহাওয়ায় সেটা প্রয়োজনীয়। কিন্তু এখন লোকেদের সেটা বাদ দিতে হচ্ছে। এটি উন্নতি বা কল্যান নয়। এই পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়াবে যে আপনাকে এক দিন অন্তর জল খেতে হবে!

আমরা মৃত্যুর দায় দায়িত্ব নিয়েছি, কিন্তু জন্মের ভার গ্রহণ করিনি।আমাদের কাছে দুটো রাস্তা আছে - হয় আমরা সচেতনভাবে আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন করবো, নয়ত প্রকৃতি নিষ্ঠুরভাবে সেটা করবে। মানুষ হওয়ার সারমর্ম হল আমরা সচেতনভাবে কাজ করতে পারি। আমার মনে হয় আমরা যদি মানুষ হই , আমাদের এটা সচেতনতার সাথে করা উচিত এবং আমাদের সাথে এরকম কিছু ঘটতে দেওয়া উচিত নয়।

caca-blog-banner