চেতনা কী? এক অতীন্দ্রিয়বাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে

মানুষের চেতনা বৃদ্ধির অর্থ কী, এমন একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই জীবনের অস্তিত্ব সৃষ্টিকারী মৌলিক বুদ্ধিমত্তার ব্যাখ্যা দান করছেন সদগুরু।
সচেতনতা কী? এক অতীন্দ্রিয়বাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে
 

প্রশ্ন: নমস্কার সদগুরু। ঈশাতে আমরা সাধনা এবং অন্য যে কাজগুলো করি, তার সঙ্গে মানুষের চেতনার বৃদ্ধির সম্পর্ক কী?

সদগুরু: চেতনা হল খুবই অপব্যবহৃত একটি শব্দ। প্রথমত বলা যাক, চেতনা বলতে আমরা ঠিক কী বোঝাই। আপনি তো আদতে বহু কিছুর যোগফল। জীবনের একটি টুকরো হিসেবে বা একটি শরীর হিসেবে আপনি হলেন নির্দিষ্ট কিছুটা মাটি, জল, বাতাস, আগুন আর আকাশ (বা ইথার)। এছাড়া রয়েছে এক মৌলিক বুদ্ধিমত্তা, যা ওই সবকটি বস্তুকে একত্রিত করে তা থেকে জীবন সৃষ্টি করতে পারে। যে জিনিসগুলো স্রেফ কাদামাটির মতো নিষ্প্রাণ পড়ে থাকে, তাই কিনা দিব্যি জীবন্ত হয়ে এখানে বসে আছেন — কী অসামান্য রূপান্তর, তাই না? বুদ্ধিমত্তার এক অকল্পনীয়, অত্যন্ত নিগূঢ় স্তর রয়েছে, যা কিনা বাতাসের মতো সাদামাটা বস্তুকেও জীবন্ত করে তুলতে পারে। বাতাস বন্ধ হলেই তো জীবন শেষ। .

শুধুমাত্র আপনি সচেতন বলেই আপনারা জীবনের অস্তিত্বকে বা বেঁচে থাকাটুকুকে অনুভব করতে পারেন। কিন্তু যদি অচেতন হতেন, আপনারা তো জানতেই পারতেন না যে, আপনারা জীবিত না মৃত।

সে কোনও গাছই হোক, বা পাখিই হোক, বা কীটপতঙ্গ, বা কেঁচো, বা হাতি, বা মানুষই হোক — সবকিছুই এই কটি সাদামাটা উপাদান দিয়ে গড়া। জীবনের সৃষ্টিকারক এই বুদ্ধিমত্তাকেই আমরা চেতনা বলি। আর শুধুমাত্র আপনি সচেতন বলেই আপনারা জীবনের অস্তিত্বকে বা বেঁচে থাকাটুকুকে অনুভব করতে পারেন। কিন্তু যদি অচেতন হতেন, আপনারা তো জানতেই পারতেন না যে, আপনারা জীবিত না মৃত। যেমন কিনা গভীর ঘুমের মধ্যে থাকলেও তো বেঁচেই থাকেন, শুধু তা জানতে পারেন না।

সত্যি কথা বলতে কী, চেতনাকে আপনারা বাড়াতে পারেন না, কমাতেও পারেন না। আমরা চেতনাকে বৃদ্ধি করা গোছের কথাবার্তা ব্যবহার করি শুধু নির্দিষ্ট কিছু প্রেক্ষাপটে। যেমন আপনি যদি নিজেকে আপনার শারীরিক কাঠামো দিয়ে খুব বেশি চিহ্নিত করেন, তবে আপনি কী এবং আপনি কী নন, সেই সীমারেখাটি একেবারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় নিজেকে আপনি এক পৃথক অস্তিত্ব হিসেবে অনুভব করেন। এর মানে হল, জীবনসংগ্রামটাই আপনার কাছে মুখ্য, যা কিনা অন্যান্য প্রতিটি প্রাণীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখনই নিজেকে আপনি এক শরীর হিসেবে চিহ্নিত করেন, সেই মুহূর্তেই আপনার পরিচয়ের সীমারেখাটিও জমাট বেঁধে যায়।

এমনকী শরীরী জগতেও কোনও কিছু যত সূক্ষ্ম হতে থাকে, তার সীমারেখাও ততই নিশ্চিহ্ন হতে থাকে। আমরা যে বাতাসটুকু শ্বাস নিচ্ছি, তার মধ্যেও কিছু আর্দ্রতা থাকে। শ্বাস নেওয়ার সময় ক্রমাগতই আমরা বাতাস ও জলকে বদলে নিই। শরীরের ভিতরে এই পরিবর্তনের জন্য আমাদের কোনও সমস্যাই হয় না, কেননা আমরা তো ওই বাতাস বা জলের সাথে চিহ্নিত নই। আমরা শুধু আমাদের শরীরের সাথেই চিহ্নিত, যাকে আমরা সকলেই ‘আমি’ বলে গণ্য করি। তাই আমরা কখনও চাই না যে, কোনও কিছুই আমাদের শরীরের সীমারেখাকে লঙ্ঘন করুক।

এই চেতনা আমাদের সকলের মধ্যেই কিছু মাত্রায় রয়েছে। প্রশ্ন হল, কতটা। না, আপনার চেতনাকে বাড়াতে হবে না — আপনাকে শুধু নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে যাতে তার খোঁজ পান আর তাকে অনুভব করতে পারেন।

ফলে যাকে আমরা চেতনা বলি, তা আমাদের পরিচয়েরই এক অতি সূক্ষ্ম দিক, আর এটা আমাদের সকলের মধ্যেই অভিন্ন। আর এই হল সেই একই বুদ্ধিমত্তা — যা আমার, আপনার ও সকলের মধ্যেই প্রতিদিনের খাদ্যকে শরীরের মাংসে পরিণত করছে। এখন আমরা যদি মানুষকে তার শারীরিক সীমারেখার সাথে তার পরিচয় থেকে সরিয়ে তার ভিতরেরই এক গভীরতর মাত্রায় নিয়ে যেতে পারি, তবে তার মধ্যে এই ‘আমি’ আর ‘আপনি’ গোছের ধারণাগুলো কমতে থাকে - ‘আপনি’ আর ‘আমি’ তখন একই মনে হতে থাকে। এর অর্থ হল চেতনা ঊর্ধ্বরত হয়েছে সামাজিক স্তরে।

প্রকৃতপক্ষে, আমরা চেতনাকে বাড়াই না। আমরা শুধু আপনাদের অনুভূতিকেই বাড়িয়ে তুলি, যাতে আপনারা নিজেরাই সচেতন হতে পারেন। এই চেতনা আমাদের সকলের মধ্যেই কিছু মাত্রায় রয়েছে। প্রশ্ন হল, কতটা। না, আপনার চেতনাকে বাড়াতে হবে না — আপনাকে শুধু নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে যাতে তার খোঁজ পান আর তাকে অনুভব করতে পারেন। চেতনা সর্বদাই বিদ্যমান। তাই যদি না হত তবে আপনারা আপনাদের নিঃশ্বাস ও খাদ্যবস্তুকে নিজেদের জীবনে বদলে ফেলতে পারতেন না। আপনারা যে বেঁচে আছেন — তার কারণই হল আপনার চেতনা। কিন্তু এ পর্যন্ত আপনারা কোনওমতে তার নাগালটুকুই পান। সেই নাগাল যত বাড়বে, আপনার এই শারীরিক সীমাবদ্ধতার অনুভূতি তত কমবে। আর একবার যদি আপনারা এই চেতনার সাথে চিহ্নিত হতে পারেন, তখন প্রত্যেকের সাথে একাত্মবোধ অনুভব করতে পারবেন। এই হল যোগের প্রকৃত অর্থ।

যোগ শব্দটির অর্থই হল এক হওয়া। মানুষেরা এই এক হওয়ার বোধটুকুকে অনুভব করার চেষ্টা করে চলেছে নানাভাবে। এই বোধ যখন খুব স্থূল প্রকাশ পায়, আমরা তাকে বলি যৌনতা। যখন আবেগের পথে প্রকাশিত হয়, তাকেই বলি প্রেম। যদি স্রেফ মানসিক প্রকাশ ঘটে, তখন লোভ, উচ্চাশা, বিজয়ের নেশা, কিংবা স্রেফ কেনাকাটার বাসনা, এমনই নানা তকমা দিই। কিন্তু এই সংযোগের বোধই যখন চেতনার পথে প্রকাশিত হয়, আমরা তাকে বলি যোগ। অর্থাৎ এমন কিছুকে আপনি অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছেন, যা আপনার নিজস্ব অংশ নয়। এর অর্থই হল, আপনার এবং অন্যের মধ্যকার দূরত্ব বা সীমারেখাকে আপনি মুছে ফেলতে চাইছেন।

যোগের অর্থ হল সবাইকে নিয়ে এক হওয়া। কিংবা অন্যভাবে বললে, আপনার আত্ম পরিচয়ের সীমানাগুলোকে মুছে ফেলা।

যৌনতাই হোক বা প্রেমের সম্পর্ক, উচ্চাশাই হোক কিংবা বিজয়ের নেশা — আসলে যাই আপনি করতে চাইছেন, তা হল যা আপনার নয়, তাকে নিজের অংশ করার চেষ্টা। এজন্যই যোগের প্রয়োজন। যোগের অর্থ হল সবাইকে নিয়ে এক হওয়া। কিংবা অন্যভাবে বললে, আপনার আত্ম পরিচয়ের সীমানাগুলোকে মুছে ফেলা। কিন্তু এসব নিয়ে কথা বলার বদলে কিংবা পাণ্ডিত্য ফলানোর বদলে, আমাদের উদ্দেশ্য এটাই যে আপনাদের আত্মপরিচয়ের এই গণ্ডীর থেকে বের করে কীভাবে সেই মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যায় যেটা কিনা শরীরী সত্তার ঊর্ধ্বে।

শাম্ভবী ঠিক এই কাজটা করে — আপনাকে এক গোধূলি অঞ্চলে নিয়ে যায়। যে অবস্থায় যেতে পারলে আপনারা শরীরের বন্ধনে আবদ্ধ থেকেও, এর বাইরের নানা মাত্রাকেই স্পর্শ করতে শুরু করেন। যাতে জীবন নিয়ে আপনাদের অনুভূতিগুলো শুধু শরীরের কাঠামোতেই আটকে না থাকে, বরং জীবনকে এক অনেক বৃহত্তর, অসামান্য ব্যাপার বলে অনুভব করতে পারেন। এটাই হল চেতনাকে বাড়ানো। যার অর্থ হল আপনার চারপাশের সমস্ত মানুষজনকেই আপনি তখন নিজের অংশ বলে অনুভব করতে পারবেন।

যেসব উপাদান আপনার হাতের পাঁচটি আঙুলকে তৈরি করেছে, তা এই পৃথিবীতে বহু আগে থেকেই ছিল — স্রেফ এখন তা আপনার হাতের পাঁচটি আঙুলে পরিণত হয়েছে। গতকাল আপনার খাবারের থালায় খাদ্য হিসাবে যা ছিল, তা তো আর আপনি নন। কিন্তু আপনি তা খেয়েছিলেন, আর আজ আপনি তাকে অনুভব করছেন আপনার নিজেরই অংশ হিসাবে। আসলে যে কোনও কিছুকেই আপনারা নিজের অংশ বলেই অনুভব করতে পারেন, যদি তাকে আপনারা আপন সীমানার অন্তর্ভুক্ত করে নেন। গোটা ব্রহ্মাণ্ডকে আপনারা খেতে পারবেন না বটে। যেটা সম্ভব সেটা হল আপনাদের পরিধিগুলোকে অন্যভাবে বাড়িয়ে তোলা।

অনুভূতির সীমানাকে এতটাই বাড়ানো যায় যে, আপনি এখানে বসেই টের পাবেন গোটা ব্রহ্মাণ্ড আপনার একটি অংশমাত্র। এই হল যোগ, এই হল চেতনার বৃদ্ধি। এ কোনও দার্শনিক উপায়ে কিংবা কোনও তাত্ত্বিক উপায়ে করার ব্যাপার নয় — বরং অভিজ্ঞতা দিয়ে করা এবং এমন এক প্রযুক্তির সাহায্যে, যা সকলের পক্ষেই ব্যবহার করা সম্ভব। প্রযুক্তি এইজন্যই কারণ প্রযুক্তির ধর্মই হল এই যে, যারাই তা শিখবেন, তাদের সবার জন্যই তা কাজ করবে। আপনাদের একে বিশ্বাস করতে হবে না, একে পুজো করতে হবে না, এমনকী একে মাথায় তুলে বয়ে বেড়াতেও হবে না। শুধুমাত্র ব্যাবহার করলেই কার্যসিদ্ধি।

 
 
 
 
  0 Comments
 
 
Login / to join the conversation1