মহাভারত পর্ব ১১: পাণ্ডবদের উৎসকথা

এই পর্বে - এক অভিশাপের ফলে দুই যুবতী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও পান্ডুকে সন্তানহীনতায় ভুগতে হয়। পরে অবশ্য কুন্তী বরদান হিসেবে পাওয়া এক মন্ত্রের সাহায্যে দেবতাদের আহ্বান করে সন্তান ধারনের ব্যবস্থা‌ করেন। আমরা পঞ্চপান্ডবের প্রত্যেকের উৎসকথা জানবো।
Mahabharat Episode 11: The Origins of the Pandavas
 

Mahabharat All Episodes

সদগুরু: পাণ্ডু কুন্তীভোজের দত্তক কন্যা কুন্তী ও মদ্র দেশের রাজকন্যা মাদ্রীকে বিয়ে করেন। একদিন পাণ্ডু শিকার করতে গিয়ে এক হরিণ যুগলকে সঙ্গমরত অবস্থায় দেখতে পেলেন। তাদেরকে সহজ শিকার ভেবে নির্বিচারে তীর চালিয়ে দিলেন। তিনি এত ভালো একজন তীরন্দাজ ছিলেন যে ঠিক যেমনটা চেয়েছিলেন সেভাবেই তাদের দুজনকে একই তীরে বিঁধে ফেললেন। গুরুতরভাবে আহত পুংহরিণটি আসলে ছিলেন হরিণরূপী এক ঋষি। মৃত্যুর আগে তিনি বললেন, "শিকারীদের মধ্যে একটা নিয়ম আছে যে গর্ভবতী বা সঙ্গমরত অবস্থায় কোনো পশুকে হত্যা করা যাবে না; কারণ এর অর্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে। তুমি এই নিয়ম ভঙ্গ করেছো। আর এর ফলস্বরূপ, তুমি যদি কখনও তোমার স্ত্রীকে কোনোরকম কামনার সাথে স্পর্শ করো, তোমার মৃত্যু অনিবার্য।" ফলে পরিস্থিতি এমন ছিল যে পাণ্ডুর তখনও কোনো সন্তান নেই; তাঁর দু'জন স্ত্রী রয়েছে, অথচ এই অভিশাপের জন্য তিনি তাঁদের কাছে আসতে পারতেন না।

একজন রাজার ক্ষেত্রে এবং তাঁর রাজ্যের ভবিষ্যতের জন্য, সন্তান না থাকাটা বিরাট বড়ো একটা সমস্যা। পরবর্তী রাজা তাহলে কে হবে?

একজন রাজার ক্ষেত্রে এবং তাঁর রাজ্যের ভবিষ্যতের জন্য সন্তান না থাকাটা বিরাট বড়ো একটা সমস্যা। পরবর্তী রাজা তাহলে কে হবে? অন্যরা যখনই দেখবে যে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে কোনো শক্তিশালী রাজপুত্র নেই, যে কেউ উচ্চাকাঙ্খী হয়ে উঠবে। এটা একটা রাজনৈতিক সমস্যা।

আগের প্রজন্মের মতো আবারও কুরুবংশের কোনো বংশধর নেই। এই পরিস্থিতিতে পাণ্ডু এতটাই হতাশ হয়ে পড়লেন যে তিনি তাঁর সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পরিত্যাগ করে স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলে গিয়ে বাস করতে লাগলেন। তিনি আশেপাশের মুনি-ঋষিদের সাথে কথাবার্তা বলে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলেন, ভুলে যেতে চাইলেন যে তিনি একজন রাজা কিন্তু গভীর এক হতাশাবোধ তাঁর মধ্যে ক্রমেই বেড়ে উঠতে লাগলো। একদিন যখন তা চরমে গিয়ে পৌঁছলো, তিনি কুন্তীকে বললেন, "আমি কী করবো? আমি নিজেকে শেষ করে দিতে চাই। তোমাদের একজনও যদি সন্তান ধারণ না করো - কুরুবংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ধৃতরাষ্ট্রেরও কোনো সন্তান নেই। তাছাড়া সে তো কেবল নামেই রাজা, আর যেহেতু সে অন্ধ - তাঁর সন্তানরা এমনিতেই রাজা হতে পারবে না।"

পাণ্ডু যখন তাঁর চরম হতাশা ব্যক্ত করে জানালেন যে তিনি আত্মহত্যা করতে চান, তখন কুন্তী নিজের বিষয়ে কিছুকথা প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, "একটা সম্ভাবনা রয়েছে।" পাণ্ডু জিজ্ঞাসা করলেন, "কী?" তখন কুন্তী বললেন, "আমি যখন কিশোরী ছিলাম, দুর্বাসা মুনি একবার আমার পিতার কাছে এসেছিলেন এবং আমি তাঁর তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলাম। তিনি আমার উপর এতটাই প্রসন্ন হয়েছিলেন যে আমাকে একটি মন্ত্র দিয়ে যান। উনি বলেছিলেন যে এই মন্ত্রবলে আমি নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো দেবতাকে আহ্বান করতে পারি এবং তাঁর সন্তান ধারণ করতে পারি। তো আপনি যদি সত্যিই চান, আপনার জন্য আমি সেটাই করবো।" কুন্তী আর তাঁকে বললেন না যে এর আগেও তিনি একজনকে ডেকেছিলেন। পাণ্ডু তো অতি উৎসাহী হয়ে উঠলেন। উনি বললেন, "অবশ্যই এটা তুমি করো। আমরা তাহলে কাকে ডাকবো?" তাঁরা ক্ষনিক ভাবলেন; তারপর পাণ্ডু বলে উঠলেন, "আমাদের ধর্মকে ডাকা উচিত। কুরুবংশের রাজা হিসেবে আমাদের অবশ্যই ধর্মপুত্রকে পাওয়া উচিত।" ধর্ম আবার মৃত্যু ও ন্যায়ের রাজা যম নামেও পরিচিত।

যুধিষ্ঠির ও ভীমের জন্ম

কুন্তী বনের মধ্যে একান্তে গিয়ে ধর্মকে আহ্বান করলেন, এবং ধর্ম এসে উপস্থিত হলেন। কুন্তী এক সন্তান ধারণ করলেন যাঁর নাম হলো যুধিষ্ঠির এবং তাঁকেই পাণ্ডুর সন্তানদের মধ্যে প্রথম বলে ধরা হয়। এক বছর পেরোতেই পাণ্ডু প্রলুব্ধ হয়ে উঠলেন এবং বললেন, "চলো আমরা আর একটি সন্তানলাভ করি।" কুন্তী বললেন, "না, আমাদের একটি পুত্র রয়েছে এবং কুরুবংশেরও বংশধর হয়েছে। এটাই যথেষ্ট।" পাণ্ডু বললেন, "না, আমাদের আর একটি সন্তানলাভ করা উচিত।" তিনি কাকুতি-মিনতি করে বললেন, "লোকে আমার সম্বন্ধে কী ভাববে যদি আমার শুধু একটাই মাত্র পুত্র থাকে। তুমি আরও একটি সন্তান ধারণ করো।" "তাহলে তাঁর পিতা কে হবেন?" পাণ্ডু বললেন, "আমাদের ধর্ম আছে কিন্তু আমাদের শক্তিরও তো প্রয়োজন। তো চলো আমরা পবনদেব বায়ুকে আহ্বান করি।" কুন্তী নিভৃতে গিয়ে বায়ুকে আহ্বান করলেন। বায়ু এলেন। যেহেতু তাঁর উপস্থিতি খুবই প্রচণ্ড ছিল, তাঁরা যেখানে ছিলেন সেই জায়গায় আর থাকতে পারলেন না। তিনি কুন্তীকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেলেন।

মহাভারতে বিশদভাবে এর একটি খুব সুন্দর বর্ণনা রয়েছে যে তাঁরা কীভাবে প্রথমে পর্বতমালা পার করলেন, তারপর সমুদ্র পেরিয়ে গিয়ে পড়লেন ক্ষীর সাগর তথা "দুধের সাগর" বা আকাশগঙ্গায়। কুন্তীকে তিনি দেখালেন যে পৃথিবীটা আসলে গোলাকার। আরও বললেন যে ভারতবর্ষে যখন দিন, ভূ-গোলকের অন্য প্রান্তে তখন রাত্রি। আর এখানে যখন রাত্রি, ওখানে তখন দিন। বললেন গ্রহের অন্য প্রান্তে থাকা আরেকটি বিশাল সভ্যতার কথা, কী ধরণের মানুষ সেখানে বাস করেন এবং তাদের কৌশল ও দক্ষতার কথা। তিনি বললেন যে সে দেশেও মহান ঋষি, মুনি ও যোদ্ধারা রয়েছেন। কুন্তী আরও একটি সন্তান ধারণ করলেন - বায়ুপুত্র ভীম, তিনি যতই বেড়ে উঠতে লাগলেন, তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ বলে অভিহিত করা হল।

অর্জুনের জন্ম

কিছুসময় পরে পাণ্ডু বললেন, "আমি জানি আমি লোভী হয়ে পড়ছি কিন্তু সুন্দর এই সন্তান দুটিকে দেখার পর কীভাবেই বা আমি নিজেকে সংযত করি? আমি আরেকটি পুত্র চাই, শুধু আর একটিই।" কুন্তী বললেন,"না, না।" দিনের পর দিন কেটে গেল কিন্তু পাণ্ডু কুন্তীকে ছাড়লেন না। কুন্তী শেষমেশ বললেন, "আচ্ছা, তাহলে কে?" পাণ্ডু বললেন," সমস্ত দেবতাদের রাজা ইন্দ্রকেই আহ্বান করা হোক - তাঁর থেকে কম কাউকে নয়।" কুন্তী ইন্দ্রদেবকে আহ্বান করলেন এবং তাঁর সন্তান মহাধনুর্ধর ও মহাযোদ্ধা অর্জুনকে গর্ভে ধারণ করলেন। মহাভারতে তাঁকে 'ক্ষত্রিয়' বলে অভিহিত করা হয়, যার অর্থ হল যোদ্ধা। তাঁর মতো যোদ্ধা আগেও কখনো ছিল না আর পরেও‌ কখনও হবে না।

মাদ্রীর ঈর্ষা

এই তিনটি দেবশিশু বেড়ে উঠতে লাগলেন এবং তাঁরা অসামান্য কৌশল, দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে লাগলেন। সকলের মনোযোগ এই তিন শিশু এবং তাদের মা কুন্তীর উপরে ছিল। পাণ্ডুর আরেক যুবতী স্ত্রী, যাঁর নিজের বলার মতো না ছিল স্বামী না কোনো সন্তান - ক্রমেই বদমেজাজী হয়ে উঠতে লাগলেন। একদিন পাণ্ডু লক্ষ্য করলেন যে মাদ্রী আর সেই মিষ্টি বধূটি নেই যাঁকে তিনি বিবাহ করেছিলেন - তাঁর চোখে-মুখে অসন্তোষের প্রকাশ । তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ”কী ব্যাপার? তুমি কি সুখী নও?" মাদ্রী বললেন, "এখানে আমি কীভাবেই বা সুখী হতে পারি? এখানে সমস্তটাই তো আপনি, আপনার তিন পুত্র আর আপনার আরেক স্ত্রীকে ঘিরে। আমার জন্য এখানে আছেটা কী?" প্রাথমিক কথাবার্তার পর মাদ্রী বললেন, "আপনি যদি কুন্তীকে বলেন আমায় মন্ত্রটা শিখিয়ে দিতে, তাহলে আমিও সন্তান ধারণ করতে পারি। তখন আপনিও আমার দিকে মন দেবেন। নইলে আমি এখানে কেবল বোঝা হয়ে রয়েছি।"

পাণ্ডু মাদ্রীর অবস্থাটা বুঝলেন। তিনি কুন্তীর কাছে গিয়ে বললেন,"মাদ্রীর একটা সন্তানের প্রয়োজন।" কুন্তী বললেন, "কেন? আমার সন্তানরা তো তাঁরও সন্তান।" পাণ্ডু বললেন,”না, সে তার নিজের সন্তান চায়। তুমি কি তাকে মন্ত্রটা শিখিয়ে দিতে পারো?" কুন্তী বললেন, "আমি মন্ত্রটা শেখাতে পারি না তবে দরকার পড়লে আমি মন্ত্রটা ব্যবহার করতে পারি আর মাদ্রী যে দেবতাকে চায় তাঁকে আহ্বান করতে পারে।" তিনি মাদ্রীকে জঙ্গলের একটা গুহায় নিয়ে গিয়ে বললেন, "আমি মন্ত্রটা প্রয়োগ করবো। তুমি যে দেবতাকে চাও তাঁকে স্মরণ কর।" তরুণীটি তখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন, "আমি কাকে ডাকবো? আমার কাকে ডাকা উচিত?" মাদ্রী দুই অশ্বিনকে স্মরণ করলেন, যাঁরা ঠিক দেবতা নন বরং নরদেবতা। অশ্ব মানে ঘোড়া - তাঁরা দুজন ছিলেন দেবতাদের ঘোড়সওয়ার আর তাঁরা এমন এক বংশভুক্ত ছিলেন যাঁরা ঘোড়ার বিষয়ে পারদর্শী। মাদ্রীর কোলে এই অশ্বিনদেরই যমজ সন্তান নকুল আর সহদেবের জন্ম হল।

পঞ্চপাণ্ডব

তাহলে কুন্তীর হল তিন সন্তান - যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন। আর মাদ্রীর দুই সন্তান - নকুল ও সহদেব। পাণ্ডু কিন্তু তখনও আরো সন্তান চাইছিলেন। একজন রাজার ক্ষেত্রে তাঁর যতোবেশী পুত্র থাকবে, ততই ভালো। যখন যুদ্ধ হবে, পুত্রের সংখ্যা কমেও যেতে পারে, কাজেই রাজ্য দখলের জন্য বা এমনকি রাজ্যশাসন করার জন্যও, যত বেশি ছেলে থাকে ততই ভালো। কুন্তী বললেন, "আর নয়। আমি আর কোন সন্তান ধারণ করবো না।" পাণ্ডু খুব মিনতি করলেন, "আচ্ছা তুমি যদি না চাও, মাদ্রীর জন্য মন্ত্রটা প্রয়োগ করো।" কুন্তী বললেন, "একেবারেই না।" কারণ যে রানীর বেশি পুত্র থাকবে সেই প্রধান রানী হবে। তাঁর তিনটি পুত্র ছিল, মাদ্রীর দুটি। আর তিনি এই সংখ্যার সুবিধাটিকে হারাতে চাননি। কুন্তী বললেন, "একদম না। এই মন্ত্র আমরা আর কখনও ব্যবহার করবো না।"

পাণ্ডুর পুত্রদের 'পাণ্ডব' বলা হতো। এই বালকগণ বড়ো হয়ে পঞ্চপাণ্ডব অর্থাৎ পাঁচ- পাণ্ডব হিসেবে পরিচিত হন। তাঁরা রাজার সন্তান ও রাজবংশের অঙ্গ ছিলেন, কিন্তু জন্ম থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠা অবধি প্রায় পনেরো বছর তাঁদের অরণ্যেই কাটে।

চলবে...

More Mahabharat Stories

Editor's Note: A version of this article was originally published in Isha Forest Flower, October 2015.