মহাভারত পর্ব ১৩: ধর্ম - ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন বিধান

মহাভারত ধারাবাহিকের এই পর্বে সদগুরু ধর্ম ও অধর্মের নানা আঙ্গিক তুলে ধরছেন যেগুলো গোটা মহাভারতের এক মৌলিক যোগসূত্র। তিনি ব্যাখ্যা করে বলছেন যে নিছক ভালো-মন্দ বিচারের অনেক উর্ধ্বে - ধর্ম হল জীবনকে পরিশীলিতভাবে দেখার এক উপায়, যার ফলে একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হয়ে সকল মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে।
Mahabharat Episode 13: Dharma – Individual and Universal Laws
 

Mahabharat All Episodes

ধর্ম ও অধর্ম

সদগুরু: মহাভারতের গোটা মহাকাব্যটাই ধর্ম ও অধর্ম - এই দুই মৌলিক আঙ্গিককে ঘিরে আবর্তিত হয়। আপনি যখন "ধর্ম" ও "অধর্ম" বলেন - বেশিরভাগ মানুষ ঠিক-ভুল, উচিত-অনুচিত বা ভালো-মন্দের সাপেক্ষে ভাবেন। ধর্ম এবং অধর্মকে নানাভাবে দেখা যায়। একজন ক্ষত্রিয় তথা একজন যোদ্ধার নিজস্ব ধর্ম রয়েছে। একজন ব্রাহ্মণ তথা একজন শিক্ষকের নিজস্ব ধর্ম রয়েছে এবং বৈশ্য ও শূদ্রের ক্ষেত্রেও তাই। এটা জীবনকে দেখার একটা পরিশীলিত উপায়। শুধু বিভিন্ন জনগোষ্ঠীরই যে নিজ নিজ ধর্ম আছে তা নয় - প্রত্যেক স্বতন্ত্র ব্যক্তিরই যে যার নিজস্ব ধর্ম রয়েছে। বারংবার আপনি ভীষ্মকে বা অন্যদের বলতে শুনবেন, "এটা আমার ধর্ম।" সবার যদি নিজেদের ধর্ম, নিজেদের আইন থাকে - তাহলে কেউ জিজ্ঞাসা করতেই পারে যে কোথায় সেই আইন? কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ এইজন্য ঘটেনি যে সকলের নিজস্ব আইন ছিল এবং সেই আইনগুলো পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধটা হয়েছিল কারণ লোকজন তাদের নিজস্ব ধর্ম লঙ্ঘন করেছিল। এটা জীবনকে দেখার একটা উপায় যেখানে সবার নিজ নিজ ধর্ম থাকা সত্ত্বেও ধর্মের একটা সর্বজনীন যোগসূত্র থাকবে যেটা কেউই লঙ্ঘন করতে পারবে না। আর এইভাবেই পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হয়েও প্রত্যেকেই স্বাধীনভাবে নিজের নিজের জীবনযাপন করতে পারত। ধর্মের এই মৌলিক যোগসূত্রের জন্যই সভ্য সমাজ গড়া সম্ভব হয়েছিল।

“মাৎস্য ন্যায়”

ধর্ম প্রতিষ্ঠার আগে 'মাৎস্য ন্যায়' বলে একটা ব্যাপার প্রচলিত ছিল। একে ঘিরে একটা গল্প রয়েছে। একদিন একটা ছোট্ট মাছ মনের আনন্দে গঙ্গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল কিন্তু তখনই অন্য কোথাও থেকে আরেকটু বড় একটা মাছ এসে জুটলো। ছোট মাছটাকে উদরাস্ত করে বড় মাছটা বেশ খুশি হল। আরেকদিন আরও বড় একটা মাছ এসে এই মাছটাকে খেয়ে ফেলল। এইভাবে আরও বড়ো এবং তার চেয়েও বড়ো মাছেরা এসে ছোট মাছেদের খেয়ে ফেলতে লাগলো। তারপর সেই বড়ো মাছটা সমুদ্রে গেল। সেখানে গিয়ে সে ছোট ছোট মাছেদের খেতে শুরু করল আর এত বিশাল হয়ে উঠল যে সে যদি কেবল তার লেজটা নাড়াত, সমুদ্র ফুলেফেঁপে উঠে হিমালয়ে আছড়ে পড়ত। বিশ্বের কাছে এটা একটা আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল। এই গল্পটিকে সঠিক প্রেক্ষাপটে বোঝা দরকার। এমনকি আজকের দিনেও এটা সত্যি - সব মাছই সে যেমনটা আছে তার চেয়ে আরেকটু বড় হওয়ার চেষ্টা করছে। সব মাছই যদি এক ছন্দে বেড়ে উঠতে থাকে, তাহলে একটা সভ্য সমাজ গড়ে উঠবে। কিন্তু একটি মাছ যদি অতিরিক্ত বড় হয়ে ওঠে সামাজিক সভ্যতা ও মৌলিক আইন ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা। বড় মাছটার খেয়ালখুশিই আইন হয়ে দাঁড়াবে। এই মাৎস্য ন্যায় বা অ-বিচারের জায়গা থেকে তারা সমাজকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা করছিলেন যেখানে প্রত্যেক স্বতন্ত্র ব্যক্তি সামাজিক আইনের মৌলিক যোগসূত্রকে লঙ্ঘন না করেও স্বাধীনভাবে থাকতে পারে এবং নিজ নিজ ধর্ম অনুসরণ করতে পারে।

মহাভারতে ধর্ম

মহাভারত এমন এক পরিস্থিতি যেখানে কয়েকটা মাছ বিশাল বড় হয়ে উঠেছিল এবং তারা আইনের মৌলিক যোগসূত্রকে কোনো মর্যাদাই দিচ্ছিল না, যা প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজস্ব স্বাধীনতা প্রদান করে। লোকে যখন আইন বা ধর্মের কথা বলত - তারা এটাকে কেবল ন্যায়সংহিতা হিসেবে উল্লেখ করত না; এটা শুধুমাত্র সমাজের শান্তি রক্ষা বা মানুষজনের প্রতিভা, ভালোবাসা ও স্বাধীনতার অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্যই ছিল না। ধর্ম হল জীবনকে সুসংগঠিত করার এমন একটি উপায় যাতে করে প্রত্যেকে নিজের চরম প্রকৃতির দিকে অগ্রসর হয়। আপনি যদি আপনার চরম, মৌলিক ও দৈব প্রকৃতির দিকে অগ্রসর হতে থাকেন, তাহলে আপনি ধর্মের পথে আছেন। আর যদি আপনি সেদিকে অগ্রসর না হন - আপনি কারোর ক্ষতি না করলেও, আপনি ধর্মের পথে নেই। মহাভারতে ধর্মের অনুষঙ্গ এটাই। যখন কেউ বলে, "এটা আমার ধর্ম," - এর অর্থ, হয়তো তাদের এটা পছন্দ নয় বা তাদের কাছে এটা স্বাচ্ছন্দ্যের নাও হতে পারে কিন্তু নিজেদের চরম প্রকৃতিতে উপনীত হওয়ার এটাই হল তাদের পথ। ভীষ্ম যখন বলেছিলেন, "এই প্রতিজ্ঞা আমার ধর্ম। কুরুবংশ ও কুরু সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লেও আমি এটা ভঙ্গ করব না - যদিও এই সাম্রাজ্যের জন্য আমি নিজের জীবন দিতে রাজী আছি।" তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন তা হল, এই পথেই তিনি মোক্ষলাভ করবেন এবং তিনি এটা থেকে সরে আসবেন না। আপনি তো শুনেছেন বিদুর কী বলেছিলেন - "একটা পরিবারকে বাঁচাতে আপনি একজন ব্যক্তিকে বিসর্জন দিতে পারেন। একটা গ্রামকে বাঁচাতে আপনি একটি পরিবারকে বিসর্জন দিতে পারেন। একটা দেশকে বাঁচাতে আপনি একটি গ্রামকে বিসর্জন দিতে পারেন। বিশ্বকে বাঁচাতে আপনি একটা দেশকে বিসর্জন দিতে পারেন। চরম প্রকৃতির জন্য আপনি গোটা বিশ্বকেও বিসর্জন দিতে পারেন।" এই প্রেক্ষিতেই তারা ধর্মকে দেখেছিলেন। তারা স্পষ্টতই বুঝেছিলেন যে মানুষের চরম প্রকৃতিই হল তাদের পরম লক্ষ্য এবং তা চূড়ান্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ভীষ্মের পরাক্রম

এর ওপরে ভিত্তি করেই তারা সমস্ত আইন রচনা করেছিলেন। রোজকার জীবনের সাধারণ নিয়মনীতিকেও তারা তাদের চরম প্রকৃতিতে উপনীত হওয়ার সোপান হিসেবে গণ্য করেছিলেন। ভীষ্ম যে এই ভয়ানক প্রতিজ্ঞাটি করেছিলেন - আমরা এটাকে এইজন্য "ভয়ানক" বলছি না যে তিনি ব্রহ্মচারী হয়ে গেছিলেন বা নিজেকে সন্তানের জন্ম দেওয়ার অক্ষম করে তুলেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত অসুবিধে বা বঞ্চনার জন্যও নয়, বরং এই কারণে যে যেই কুরুবংশ ও দেশকে তিনি এত ভালোবাসতেন তাকে সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন। যা তাঁর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল সেটাকেই তিনি সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন - এই ব'লে যে এটাই তাঁর ধর্ম এবং তাঁর ‌ মোক্ষলাভের উপায়। আমরা যত এগিয়ে যাব, আপনি এমন নানা পরিস্থিতি দেখতে পাবেন যেখানে ভীষ্মকে প্রায় অতিমানব বলে মনে হবে। একজন মানুষ যদি তার ভেতরে থাকা জীবনের বীজকে রূপান্তরিত করতে ইচ্ছুক হন - একটিমাত্র কোষ, যা আরেকটা মানুষ সৃষ্টি করতে পারে - সেটাকে যদি জীবনীশক্তিতে রূপান্তরিত করতে ইচ্ছুক হন, তখন এটা পারমাণবিক শক্তির মতো হয়ে ওঠে। একটি মাত্র পরমাণু বিপুল শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। বিভিন্ন সময়ে লোকে বলেছে যে ভীষ্ম ব্রহ্মচারী বলে তারা তাঁর সাথে যুদ্ধে পেরে উঠছেন না। তারা ভীষ্মকে মারতে পারত না কারণ, তিনি তাঁর দেহের প্রত্যেকটি বীজ জীবনীশক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন - যা তাঁকে একরকমভাবে ইচ্ছামৃত্যুর অধিকারী করে তুলেছিল। এই প্রেক্ষিতেই লোকে বলত যে ভীষ্মের নিজের মৃত্যুক্ষণ নির্বাচন করার ক্ষমতা ছিল। তিনি অমর ছিলেন না কিন্তু তিনি তাঁর মৃত্যুর স্থান-কাল নির্বাচন করতে পারতেন, যেটা প্রায় অমরত্বেরই সামিল। কেউ আপনাকে অভিশাপ দিলে তবেই আপনি অমর হবেন। কল্পনা করতে পারছেন আপনাকে যদি চিরদিন বেঁচে থাকতে হত, এটা কীরকম অত্যাচার হয়ে দাঁড়াত? অমরত্ব একটা অভিশাপ। আপনি যখন মারা যেতে চান তখন মারা যেতে পারাটা একটা বর।

মহাভারত - সেই সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে

এটা কারোর নিজের শক্তি ও প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগানোর এক প্রক্রিয়া। মহাভারতে আরেকটি উদাহরণ হল অস্ত্র - শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্র। লোকে বলত যে যুদ্ধক্ষেত্রে অস্তিত্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র কণাকে সবচেয়ে বড়ো শক্তিতে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। এটা শুনতে পারমাণবিক বোমার মত লাগলেও তারা তখনও তীর-ধনুকই ব্যবহার করেছিলেন। তারা নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্রের প্রভাবের বিষয়েও বলেছিলেন এই ধরনের কিছু কথার মাধ্যমে - যেমন, "এই অস্ত্র ব্যবহার করে সারা বিশ্বকে ধ্বংস না করলেও মায়ের গর্ভে থাকা শিশুরা দগ্ধ হয়ে যাবে।" হয় তাদের অবিশ্বাস্যরকম সীমাহীন কল্পনাশক্তি ছিল, নয়তো সত্যিই তাদের এসবের জ্ঞান ছিল। তাদের কি এই ধরণের কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল, তারা কি কোথাও সেগুলো দেখেছিল, নাকি কেউ অন্য কোথাও থেকে এসে তাদেরকে এসব কথা বলেছিল? আমরা সেটা জানি না, তবে বিশেষ যত্ন সহকারে আপনাকে এই কাহিনীটা দেখতে হবে। এটা শুধুমাত্র কয়েকজন মানুষের লড়াই-যুদ্ধ বা কারোর রাজ্য কিংবা স্ত্রী-সন্তান লাভ করতে চাওয়ার কাহিনী নয়। এতে আরও অনেক মাত্রা রয়েছে।

চলবে...

More Mahabharat Stories

Editor's Note: A version of this article was originally published in Isha Forest Flower, December 2015.