আদিযোগীর বিশালত্ব প্রসঙ্গে

দিল্লীর এস আর সি সি কলেজের ছাত্রদের প্রশ্ন ছিল, আদিযোগীর প্রতিমূর্তিটি বিশালাকৃতি করার পিছনে কি কোনও কারণ আছে ? অবয়বের ক্ষুদ্রাকৃতি বা বিশালতা নির্ভর করে যে দেখছে তার বোধ বা অনুভূতির উপর, কিন্তু আদিযোগীর জ্যাতিমিক রূপ-নকশাটি তৈরি হয়েছে জীবনের তিনটি মাত্রাকে প্রতিফলিত করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, সদগুরুর বিশ্লেষণ –
Image of 112 ft Adiyogi statue at the Isha Yoga Center taken during sunset | Why is the Adiyogi So Huge?
 

প্রশ্ন: সদগুরু, আপনার আশ্রমে আদিযোগীর যে মূর্তিটি স্থাপন করেছেন তার বিপুলায়তন যে কোনও দর্শনার্থীকে বিষ্ময়ে হতবাক করে দিতে পারে। আজকাল যা হচ্ছে, কোনও বিষয়কে মানুষের নজরে আনতে যেমন গণ আড়ম্বরের আয়োজন হয়, এক্ষেত্রেও কি সেই সূত্রই অনুসরণ করা হয়েছে ?

সদগুরু: একটি মাত্র মূর্তিই তৈরি করা হয়েছে – গণ আড়ম্বর আসছে কোথা থেকে ?

প্রশ্ন: মূর্তিটি অত বিপুলায়তন কেন?

এক্ষেত্রে প্রশ্নটা আকৃতি তথা আদিযোগীর মূর্তির বিশালায়তন নিয়ে নয়, তার জ্যামিতিক অনুপাতটিই বিবেচ্য। একটি নির্দিষ্ট আকৃতি প্রদান করার মূল কারণ হল, স্থাপত্যটিকে সঠিক জ্যামিতিক মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ করা

সদগুরু:কোনটি ক্ষুদ্র বা কোনটি বিশাল তা পুরোপুরি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট মানুষটির উপলব্ধির ওপর। আশ্রমের সব বাসিন্দাই বলেছেন, “সদগুরু, মূর্তিটি আরও একটু বড় হলে ভাল হত। পিছনের পাহাড়টির তুলনায় মূর্তিটিকে খুব ছোট মনে হচ্ছে”। সুতরাং, এই হল মানুষের উপলব্ধি, কিন্তু তবুও দৃশ্যমানতার প্রভাব তো কিছু থেকেই যায়। ধরো, এই মুহূর্তে আমি তোমাকে বললাম, “পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মধ্যে চারটি ইন্দ্রিয় এখনই তোমার কাছ থেকে নিয়ে নিতে চাই”। সেক্ষেত্রে কোনটি তুমি তোমার কাছে রাখতে চাইবে, নাসিকা না জিহ্বা ? 

প্রশ্নকর্তা: প্রত্যেকটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সদগুরু: সবকটিই গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু এখন তোমাকে চারটি হারাতেই হবে। আর ইন্দ্রিয়হীন হয়েও কীভাবে বেঁচে থাকা যায়, সেটাও শিখে নেওয়া যেতে পারে, কারণ জীবন তোমাকে সবকিছু একসাথে রাখতে নাও দিতে পারে। সুতরাং, কোন চারটি ইন্দ্রিয় তুমি হারাতে চাও এবং কোনটিকে তুমি তোমার কাছে রেখে দিতে চাও ?

প্রশ্ন: পাঁচটির নাম আর একটু যদি স্পষ্ট করে বলেন ?

সদগুরু: তোমার চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা বা ত্বকের মধ্যে চারটি নিয়ে নিতে চাইলে তুমি কোনটিকে নিজের কাছে রেখে দিতে চাইবে, বলো ?

প্রশ্নকর্তা: চোখ!

সদগুরু: অবশ্যই চোখ। কারণ পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মধ্যে দর্শনেন্দ্রিয়টির প্রভাব তোমার জীবনে সর্বাধিক। যদি তুমি সারমেয় হতে, তুমি বলতে “নাসিকা”, কারণ নাসিকার ঘ্রাণশক্তিই একটি সারমেয়র জীবনে বেঁচে থাকার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কিন্তু মানুষের জীবনে দৃশ্যমানতার প্রভাব সর্বাধিক। এই পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায় যে, প্রশ্নটা আকৃতি তথা আদিযোগীর মূর্তির বিশালায়তন নিয়ে নয়, তার জ্যামিতিক অনুপাতটিই বিবেচ্য। একটি নির্দিষ্ট আকৃতি প্রদান করার মূল কারণ হল, স্থাপত্যটিকে সঠিক জ্যামিতিক মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ করা। 

 

আদিযোগীর জ্যামিতিক নকশাটি নিঃশব্দ নিঃসরণের প্রতিমূর্তি। ধরো, আজ বাড়ি গিয়ে তুমি দেখলে যে, তোমার বাবা একটু অন্যরকম ভাবে বসে আছেন এবং তার সেই বসার ভঙ্গী দেখেই তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন না সুখী আছেন বা আনন্দিত না বিব্রত হয়ে আছেন। আদিযোগীর মাধ্যমে জীবনের তিনটি মাত্রাকে আমরা নীরবে প্রতিফলিত করতে চেয়েছিলাম – জীবনের উচ্ছ্বাস, নৈঃশব্দ্য ও নিবিড় তন্ময়তা। আড়াই বছরের নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই মুখাবয়বটি এত নিখুঁত হয়ে উঠেছে। অসংখ্য মুখাবয়ব তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু জ্যামিতিক নকশাটি নির্ভুল করার জন্য আমাদের আশি ফুটেরও বেশি উচ্চতার প্রয়োজন ছিল। এবং তখনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, সংখ্যাটিও তাৎপর্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন আর সেই কারণেই একশো বারো ফুট উচ্চতাটি গৃহীত হয়েছিল। 

আদিযোগীর মাধ্যমে জীবনের তিনটি মাত্রাকে আমরা নীরবে প্রতিফলিত করতে চেয়েছিলাম – জীবনের উচ্ছ্বাস, নৈঃশব্দ্য ও নিবিড় তন্ময়তা। আড়াই বছরের নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই মুখাবয়বটি এত নিখুঁত হয়ে উঠেছে

আদিযোগীর উপস্থাপনায় মানবিক জীবনকে তার সর্বোচ্চ সম্ভাবনায় বিকশিত করার জন্য একশো বারোটি পথের রূপরেখা নির্দিষ্ট করা ছিল। এই কারণেই আদিযোগীর মূর্তিটিকে একশো বারো ফুট উচ্চতা দান করা হয়েছে। আশি বা নব্বই ফুট উচ্চতার মধ্যে জ্যামিতিক নকশাটি নিখুঁত ভাবে প্রতিভাত করা সম্ভব ছিল না। অতঃপর আদিযোগীর মূর্তির উচ্চতা নির্ধারণে তার পচ্ছন্দের সংখ্যাটিকেই বেছে নেওয়া হয়। সঙ্গত কারণেই আদিযোগীর মূর্তির উচ্চতা একশো বারো ফুট। 

সম্পাদকের কথা: যে প্রশ্নের উত্তর দিতে সকলেই অপারগ, যদি এমন কোনও বিতর্কিত বা স্পর্শকাতর প্রশ্ন থাকে অথবা যদি কোনও আপাত কঠিন প্রশ্ন নিজেকে ক্রমাগত বিব্রত করতে থাকে, সেক্ষেত্রে জীবনের সব অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এখানে। সদগুরুকে আপনার প্রশ্ন করুন UnplugWithSadhguru.org.