মহাভারত পর্ব ৪৮ : কৃষ্ণ এবং অর্জুনের সম্পর্কের সত্যতা

সদগুরু অর্জুন/কৃষ্ণ এবং নর/নারায়ন - এর তুলনা সম্পর্কে একটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন- অথবা তাঁরা কি এক এবং অভিন্ন? এই জুটির সম্পর্কের ব্যাপ্তি এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব কিভাবে একে অন্যের পরিপূরক, সেই সম্পর্কে জানুন।
Sadhguru Wisdom Article | Mahabharat Episode 48: The Truth About Krishna and Arjuna’s Relationship
 

Mahabharat All Episodes

এতক্ষন পর্যন্ত যা ঘটেছে : অশ্বত্থামা পান্ডব পুত্রদের ঘুমের মধ্যে হত্যা করেন এবং অর্জুন অশ্বত্থামার কপালে খচিত রত্নটি প্রতিহিংসায় উৎপাটিত করেন, যেটি তার শক্তির উৎস ছিল। অর্জুন রত্নটি তুলে নেবার পর, অশ্বত্থামা তার মানসিক ভারসাম্য হারান।

প্রশ্নকর্তা r: সদগুরু, আপনি নর/নারায়ণের সম্পর্কের সাথে অর্জুন এবং কৃষ্ণের সম্পর্কের সাদৃশ্য তুলে ধরেছেন। এই ব্যাপারে আমাদের আরো কিছু বলবেন?  

সদগুরু: নর/ নারায়ণ সম্পর্কের মূলভাব বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হতে পারে। এর তাৎপর্য এটাই যে, এমনকি যদি ভগবানও মানুষের পৃথিবীতে নেমে আসেন, মানুষের সাহায্য তাঁর প্রয়োজন। এমনকি ঈশ্বর স্বয়ং যদি আপনার ঘরে বাস করেন, আপনার সাহায্য তাঁর প্রয়োজন- অন্যথায় এটা কাজ করবে না। দৈব উপস্থিতি আপনার সাথে থাকতে পারে, কিন্তু আপনার সাহায্য ছাড়া কিছুতেই সেটা ফলপ্রসূ হবে না। এটাই হল বার্তা। 

নাম আলাদা, ধারণা একই;

নর/নারায়ণ, এই রূপে অনেক বার কাজ করেছেন। অর্জুন / কৃষ্ণও কি একই ব্যক্তি? অর্জুন, আমরা বলতে পারি, একই ব্যক্তি। বলা যায়, স্মৃতি তাকে বয়ে নিয়ে যায় এবং একটি নির্দিষ্ট ঘনত্ব দেয়, তাকে আমরা বলি নিয়তি। আমরা কৃষ্ণের কথায় পরে আসছি, কারণ কৃষ্ণ বলে কিছু হয় না। কৃষ্ণ আলোর মতো। যা সবকিছুর ভিত্তি, সেটাই নিজেকে একটি নির্দিষ্ট উপায়ে প্রকাশ করছে; এটা যেকোন মুহূর্তে নিজেকে আলাদা করতে পারে। অন্য কথায় 'নর' মানে হ'ল- একই উৎস, অনেক বেশি বাধ্যবাধকতা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে; 'নারায়ণ' মানে সেই একই উৎস, অনেক বেশি সচেতনভাবে উদ্ভাসিত হচ্ছে। 

'নর' মানে হ'ল-একই উৎস, অনেক বেশি বাধ্যবাধকতা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে; 'নারায়ণ' মানে সেই একই উৎস অনেক বেশি সচেতনতা নিয়ে উদ্ভাসিত হচ্ছে।

সচেতনতার ভারের জন্য নারায়ণের নিজের কাজ সীমিত হয়ে যায়। তাই তিনি নর-কে বেছে নেন, যিনি কাজের জন্য একটু বেশি আসক্ত । অন্য সভ্যতায় এই একই জিনিস প্রতিফলিত হয়- ঈশ্বর এবং তাঁর পুত্র যুগ্মভাবে কাজ করেন। নর/নারায়ন অর্থ এটাই- একই উৎস এক জায়গায় অনেক বেশি বা পূ্র্ণ সচেতনতায় প্রকাশিত হয়, অন্য জায়গায় অনেকটা বাধ্যবাধকতাযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। একটি কর্মে আবদ্ধ জীবন অনেক বেশি কাজ করতে সক্ষম; একটি সচেতন জীবনের অধিক সক্রিয় হওয়া উচিত নয়। এটাই হল প্রতীক। 

কৃষ্ণ সারথী হিসেবে আসেন; তিনি যুদ্ধ করেন না; তিনি কর্মের সাথে যুক্ত নন। যখন আপনি একইসাথে সচেতন এবং কর্মে আবদ্ধ হবার মত "অপরাধ" করে বসেন, তখন অনেকরকম ভাবে, আপনি নিজেকে পঙ্গু করে ফেলেন এবং আপনার জীবনের ব্যাপ্তিকাল এবং পরিসর দুটোই সীমিত করে দেন। সুতরাং তারা যুগ্মভাবে কাজ করছিলেন। যদি কৃষ্ণ নিজেই কর্ম হবার সিদ্ধান্ত নিতেন, তাহলে তিনি যা, তার পরিসর এবং সময়কাল দুটোই কমে যেত। কিন্তু এই জীবনে, ব্যাপ্তিকাল তাঁর কাছে কোনো ব্যাপার নয়; তিনি শুধু পরিসরের দিকে নজর রেখেছেন। 

কর্ম- হ্যাঁ, ফল- না

কেবলমাত্র মানুষের মন এবং মানুষের শরীর স্বতন্ত্র। সুতরাং এখানে, "আরো কিছু বেশি" যা শরীর এবং মনের অতীত, তা সর্বব্যাপী এবং সেটাই কৃষ্ণ/নারায়ন রূপে আসেন। সেই "আরো কিছু বেশি" সর্বদা অর্জুন/নর- এর সাথে থাকেন। কৃষ্ণ বলেন, "হে অর্জুন, আমি তোমার সঙ্গে আবদ্ধ। তোমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমি তোমার সঙ্গে থাকব, তোমার প্রত্যেকটি কর্মে থাকব। এটা আমার উপর ছেড়ে দাও। ইতস্তত করো না, শুধু কাজ করে যাও। " এরকম কথার পিছনে যে বুদ্ধিমত্তা আছে সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। সাধারণভাবে মনে হবে যে, "ও, কৃষ্ণ বলেছেন, 'এটা আমার উপর ছেড়ে দাও, ' সুতরাং আমি এটা ছেড়ে দিয়ে ঘুমাবো। " আমি যদি কাউকে বলি, "চিন্তা করো না, আমি দেখবো," নির্বোধগুলো কিছুই করবে না।  

যখন কৃষ্ণ বলেন," এটা আমার ওপর ছেড়ে দাও আর কাজ করে যাও," তিনি বলছেন, ফলটা আমার ওপর ছেড়ে দাও, কাজটা আমার ওপর ছেড়ো না। কাজ তোমারই আছে।

যখন কৃষ্ণ বলছেন," এটা আমার উপর ছেড়ে দাও এবং কর্ম করো, " তিনি শুধু বলছেন, "কর্মের ফল আমার উপর ছাড়ো। কাজটি আমার ওপর ছেড়ো না। কাজটি এখনো তোমার। যদি তোমার কাজটি আমার উপর ছেড়ে দিতে পারতে, তোমার অস্তিত্বই থাকত না। আমি নিজেই কাজ করতাম- কেন আমার তোমাকে প্রয়োজন হবে? কর্মের ফল আমার উপর ছেড়ে দাও- কর্মটি তোমার সঙ্গে রাখ। " আপনাদের এটা উপলব্ধি করা এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এই ব্যাপারে সচেতন থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ- যে কর্ম অপনার, কিন্তু কর্মের ফল আপনার নয়। আপনার বুদ্ধিমত্তা, উপলব্ধি এবং কল্পনার বাইরেও অনেক শক্তি আছে। এই ছায়াপথে, সৌরজগৎ এবং একটি গ্রহ হিসেবে এই পৃথিবী কেবল কনিকা মাত্র। 

বিশুদ্ধ কর্ম বনাম আত্মজ্ঞান 

এই মুহূর্তে যে সব শক্তিগুলি এই গ্রহের উপর কাজ করে চলেছে সেগুলো আপনার উপলব্ধিতে নেই। কোন একটি শক্তি এই ছায়াপথের ওপর কিছু করতে পারে- আপনি উধাও হয়ে যেতে পারেন, গ্রহ উধাও হয়ে যেতে পারে, সৌরজগৎ বিলুপ্ত হতে পারে, এই ছায়াপথই অদৃশ্য হতে পারে। এমনকি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমাদের ছায়াপথটি একটি সামান্য ঘটনা। এই কারণে যখন যক্ষ জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কোনটি সবথেকে আশ্চর্য ঘটনা? " যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, "সবথেকে পরমাশ্চর্য এটাই যে, যদিও মানুষ মরণশীল, তারা ভাবে তারা চিরদিনের এবং তারাই সবকিছু। " অচৈতন্য সবথেকে বিস্ময়কর বস্তু। যত বারই আপনি তাদের স্মরণ করান না কেন, মানুষ অজ্ঞানই থাকে। 

সুতরাং অর্জুন হলেন বিশুদ্ধ কর্ম। আর কৃষ্ণ আত্মজ্ঞান। কৃষ্ণ ক্রমাগত তাঁর "কর্মরূপ যন্ত্র" অর্জুনকে মনে করান যে এটাই উপায়, কিন্তু কর্মরূপ যন্ত্র ভাবতে শুরু করে যে সে নিজে থেকেই বর্তমান। আপনি এই গ্রহ থেকে জন্ম নিয়েছেন, এবং একদিন আপনি ফিরে যাবেন, কিন্তু আপনি ভাবেন আপনি নিজেই একটি সম্পূর্ণ জগৎ। আপনার উপলব্ধিতে, আপনাকে ছাড়া মহাবিশ্ব অস্তিত্বহীন। যখন আপনি ঘুমান, মহাবিশ্ব বিলুপ্ত হয় না কি? 

মুক্তির একমাত্র উপায়

এই মুহূর্তে, আপনার অস্তিত্ব আছে এবং আপনি এই চক্রব্যুহের ভিতর, একটি চাকার ফাঁদে আটকে পড়েছেন। আপনি জানেন না কিভাবে আপনি এর ভেতরে এলেন, নিশ্চিতভাবে আপনি এটাও জানেন না যে কিভাবে এর বাইরে বেরোতে হবে। কিন্তু যদি আপনার অস্তিত্বই না থাকে, আপনি বাইরে। মনে করুন আপনি একটি হলে বসে আছেন; সব দরজা বন্ধ; আপনি জানেন না যে কিভাবে বের হতে হবে। কিন্তু আপনি যদি উধাও হয়ে যান, আপনি বাইরে। আপনি না ভেতরে না বাইরে, কিন্তু আপনি মুক্ত। সুতরাং আমরা পূর্বজ্ঞান লাভ করেছিলাম কিভাবে অস্তিত্বহীন হওয়া যায়। সেইজন্য যে কাজই হোক ঠিক আছে, কিন্তু যখন তারা এর বাইরে যেতে চান, প্রত্যেকেই শিবকে খোঁজেন। 

যেটা নেই সেটাই একমাত্র জিনিস যা সবকিছু থেকে মুক্ত। যেটা আছে, সেটা কোনো রকমের ফাঁদ হতে বাধ্য।

শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিজস্ব লিঙ্গকে পূজা না করে, যা তিনি সর্বদা নিজের সাথে রাখতেন, তাঁর জীবনের একটি দিনও শুরু করতেন না। যাই হোক না কেন, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, এমনকি যুদ্ধের ১৮ দিন সময় কালেও, যদিও সবাই তাঁকে ঈশ্বর হিসেবে দেখতেন, কৃষ্ণ সর্বদা তাঁর দিন শুরু করার আগে লিঙ্গ পূজা করতেন। কারণ মুক্তির একমাত্র উপায় হল অস্তিত্বহীন হওয়া। শিবের অর্থ 'সেটাই, যেটা নেই'। যেটা নেই সেটাই একমাত্র জিনিস যা সবকিছু থেকে মুক্ত। যেটা আছে, সেটা কোনো রকমের ফাঁদ হতে বাধ্য।

যেটা আছে, তা কোন ধরনের আবর্তনশীল জিনিস হতে বাধ্য, কোন চক্র, কোন এক ধরনের ঘুর্ণি যেটা সর্বদা ঘুরেই চলেছে। আপনি যাই করুন না কেন, আপনি এক চক্র থেকে বাইরে যাবেন এবং অন্য একটি চক্রে পড়বেন, নিরবিচ্ছিন্নভাবে। আপনি পছন্দ করুন বা নাই করুন, আপনি এর একটি অংশ। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার দেশে নোংরা রাজনীতি চলতে থাকে, আপনি পছন্দ করুন বা নাই করুন, আপনি এর একটি অংশ। যদি তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, সেটা আপনাকে ভেতরে টেনে নেবে। "আমরা ভেল্লিয়ানগিরি পর্বতে বসে আছি; বাইরে যেসব নিরর্থক জিনিস ঘটে চলেছে আমরা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নই" - এটা সত্য নয়। যদি এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, আপনাকে ঠিক ভেতরে টেনে নেবে। কোন না কোন ভাবে আপনি একটি চক্রের অংশ, সচেতনভাবে অথবা অচেতনভাবে। সচেতনভাবে সেখানে থাকাই ভালো। অস্তিত্বহীন হওয়াই সকল চক্রের বাইরে যাবার এক মাত্র রাস্তা। 

একটি জীবন্ত সূত্র 

প্রত্যেকদিন, এমনকি কৃষ্ণও নিজেকে স্মরণ করান যে শিবই উপায়। অস্তিত্বহীন হাওয়াই একমাত্র রাস্তা। দেহ (শরীর) কোন ভাবে মারা যাবেই; এটা যেকোন ভাবে বিলুপ্ত হবে; পৃথিবী একে আত্মস্থ করবে। সে আপনি যুধিষ্ঠির, দুর্যোধন অথবা কৃষ্ণ, যেই হোন না কেন- পৃথিবী আপনাকে আত্মস্থ করবেই। শরীর সমস্যা নয়; আপনার অন্যান্য মাত্রাগুলোই হ'ল সমস্যা। সেই ব্যাপারগুলো অস্তিত্বহীন করাই হল আসল খেলা। সেই মূল সূত্রটাই কৃষ্ণ বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। এটা কোন শিক্ষাদান নয়। আমাদের শরীরের বাইরে যা কিছু আছে তা অস্তিত্বহীন, এটা বোঝাবার জন্য তিনি তাঁর নিজের জীবনকে একটি সূত্রে পরিণত করেছেন, কারণ একমাত্র সেই ভাবেই আপনি মুক্ত হতে পারেন।

চলবে..

More Mahabharat Stories

Editor’s Note: A version of this article was originally published in the Forest Flower magazine, May 2019. To subscribe online, click here. The Mahabharat series is based on Sadhguru’s talks during the one-time Mahabharat program that took place in February 2012 at the Isha Yoga Center. Through the lives and stories of the varied characters, Sadhguru takes us on a mystical exploration into the wisdom of this immortal saga.

 
 
  0 Comments
 
 
Login / to join the conversation1