কিভাবে শহরাঞ্চলে বন্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব

যেহেতু ভারতের বেশিরভাগ বড় শহরগুলি প্রবল বৃষ্টির কবলে পড়ে , আমরা চেন্নাই থেকে মুম্বাই পর্যন্ত রাস্তাগুলিতে বন্যার দৃশ্য দেখি। সদগুরু ব্যাখ্যা করছেন, কিভাবে সমস্যার মূল কারণের প্রতিবিধান করে শহরে বন্যা প্রতিরোধ করা যায়।
sadhguru wisdom article | How to Prevent Floods in Cities
 

সদগুরু: আপনি দেখুন ভারতীয় উপমহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সবকটি শহর - মুম্বাই ,হায়দ্রাবাদ ,চেন্নাই ,ব্যাঙ্গালোর, গত দশকে বন্যার কবলে পড়েছে। এই ধরনের কথা আমরা আগে কখনো শুনিনি। এটা ঘটছে কারণ আমরা এই পরিমানের বৃষ্টিপাত পরিচালনা করতে প্রস্তুত নই। বিশ্ব উষ্ণায়নের সাথে সাথে দক্ষিণ উপদ্বীপ গুলি দিনে দিনে আরো বেশি করে বৃষ্টি পাবে, এমনকি আমরা সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিলেও এটি বিপরীতে ঘুরতে কয়েক বছর সময় নেবে।

আমরা মনে করি, যে ফুটপাতের উপর দিয়ে আমরা হাঁটি- সেগুলো সব কংক্রিটের হতে হবে। না, এটা এমন ভাবে করা যেতে পারে যেখানে একটা স্থিতিশীল তল থাকবে এবং একই সঙ্গে বৃষ্টির জল মাটিতে ঢোকার পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে।

আমাদের বেশিরভাগ রাস্তা বর্ষাকালে স্রোত এবং নদীর মতো বয়ে চলে। এটি পরিচালনা করতে নগর প্রশাসনের কিছু আইন পাস করা দরকার। যেমন ধরুন আমরা ভাবি- যে ফুটপাথ গুলিতে আমরা হাঁটি, সেগুলি সবই কংক্রিটের হওয়া দরকার। না, এটা এমন ভাবে করা যেতে পারে যেখানে একটি স্থিতিশীল তল থাকবে এবং একই সঙ্গে বৃষ্টির জল প্রবেশ করার পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে । এটা হওয়া দরকার। 

শহরে আমরা একটা আইন পাস করতে পারি যে খালি জায়গায় সমস্ত নতুন নির্মাণ-কাজে সছিদ্র কংক্রিট ব্যবহার করতে হবে, পুরোপুরি বন্ধ কংক্রিট নয়।

শহরের বর্তমান অংশ পরিবর্তন করার চেষ্টা করা একটি বিরাট ব্যাপার কিন্তু এমন কয়েকটি সহজ প্রযুক্তি রয়েছে যা বিশ্বের কিছু শহরে গৃহীত হয়েছে। আমি এই সব জায়গায় গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। চাট্টানুগা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহর যা আমাদের যোগ কেন্দ্রের খুব কাছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পার্কিং এলাকা অনেক অনেক বর্গ মাইল বিস্তৃত হয়। তো তারা যে সহজ কাজটি করেছে তা হলো- পার্কিং এলাকার মেঝেতে কংক্রিট ব্লকগুলোকে সরিয়ে সছিদ্র কংক্রিট ব্লক দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে, যার মধ্যে ছিদ্র রয়েছে। এটি একটি বিরাট পার্থক্য তৈরি করেছে। চাট্টানুগার মতো ছোট শহরের জন্য এর ব্যায় হয়েছে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার। সুতরাং বিনিয়োগ প্রয়োজন। কমপক্ষে আমরা শহরে একটা আইন পাস করতে পারি যে খোলা জায়গা গুলির সমস্ত নতুন নির্মাণে অবশ্যই ছিদ্র যুক্ত কংক্রিট ব্যবহার করতে হবে, সম্পূর্ণরূপে বন্ধ কংক্রিট নয়। এগুলো হলো ছোটো ছোটো জিনিস যা আমরা ক্রমবর্ধমান উপায়ে করতে পারি।

সর্বোপরি মানুষের পদচিহ্ন এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে এই পৃথিবীতে আর কিছুই হবার জায়গা নেই। আমার শৈশব কালে ব্যাঙ্গালোর শহরে হাজারেরও বেশি পুস্করিণী ,সরোবর আর গোটা তিনেক বহুবর্ষজীবী নদী ছিল। আজ আর সেই সব নদীর কোনো চিহ্নই নেই, মাত্র আশিটির মতো পুস্করিণী আর সরোবর রয়েছে। এরমধ্যে কেবল ছত্রিশটিতে সত্যিকারের জল রয়েছে, বাকিগুলো সব নর্দমার জল, রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থে ভরা। আমরা আর জানিই না যে এই জলাশয়গুলি ঠিক কোথায় ছিল। সবকিছুর উপরেই নির্মাণ করা হয়েছে। চল্লিশ বছর ধরে এটা ঘটেছে। এটা হলো জনসংখ্যার চাপ।  

চেন্নাইয়ে লোকজন বুঝতেই পারেননি যে তারা তাদের বাড়ি বানিয়েছে নদীর তীরে, প্লাবনভূমিতে এবং প্রচন্ড বৃষ্টির ফলে প্রতি তিন বছরে তারা একবার করে ভেসে যান । এক বছরে আবার সব শুকিয়ে যায় আর লোকজন সব ভুলে গিয়ে আবার কিছু নির্মাণ করেন। ব্যাঙ্গালোরের সুভাষনগর মাঠ যেখানে আজ বাস পার্কিং হয়, সেটি একটি হ্রদ ছিল। যেখানে হ্রদ ছিল, লোকেরা সেখানে ক্রিকেট খেলে। আমাদের কখনোই ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় যে আমরা আমাদের খাবার খেয়েছি, জল পান করেছি বলেই এসবকিছু আমরা করতে সক্ষম। আমরা আর যাকিছুই করি না কেন তা গৌন; এই দেশের জল আর মাটিই হলো প্রাথমিক সমস্যা।  

যদি আমাদের নদী, হ্রদ ও পুকুরগুলিকে ভরপুর রাখতে হয় তো এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা জমির পরিলেখ বুঝি, কিভাবে অতীতে জলধারা প্রবাহিত হতো ; এবং আমাদের সেই সাহস থাকা উচিত ওই বাড়িগুলি সরিয়ে দেবার - সেটা আমার বা আপনার যারই হোক না কেন। সরকারকে এরকম আইন করতে হবে যে আমরা যদি ওই বাড়িগুলি সরিয়ে দিই তো অন্য কোথাও বাসার ব্যবস্থা করা হবে। এটা একটা জটিল প্রক্রিয়া এবং মানুষজন আপত্তি করবে ও আদালতে যাবে। এটা খুবই জটিল ব্যাপার, তবে অন্তত শহরের নতুন অংশ যেটা আমরা তৈরী করছি, সেখানে অব্যশই এমন ভাবে করতে পারি যে জল সংরক্ষন স্বাভাবিক উপায়েই ঘটবে।  

মূলতঃ, ভারী বৃষ্টি হলেই আমরা বড় শহরে বন্যা দেখতে পাই - কারণ সেখানে কোনো গাছপালা নেই ওটাকে ধরে রাখার মতো। আপনি যদি বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে চান তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো যে জমিতে যথেষ্ট গাছপালা থাকতে হবে যাতে মাটি জল ধরে রাখতে পারে। একমাত্র তবেই জলকে ধরে রাখা যাবে, অন্যথায় এটা শুধু বয়েই যাবে। সেই জন্যেই আমি কাবেরী -কলিং হাতে নিয়েছি, কাবেরী নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে। এটার অঙ্গ হিসেবে আমরা কৃষকদের সাহায্য করার কথা ভাবছি, ২৪২ কোটি গাছ লাগানোর জন্য আর তার সাথে কৃষি-বনায়ন শুরু করতে। আমরা পৃথিবীকে দেখাতে চাই যে ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে একটা নদীকে সত্যিসত্যিই বহুলাংশে পুনরুজ্জীবিত করা যায়; এবং একই সাথে কৃষকদের আয় অনেকগুন বাড়ানো যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যে এটা প্রকৃতি বনাম অর্থনীতির যুদ্ধ নয়। প্রকৃতিকে পুনুরুজ্জীবিত করাও ভালো লাভজনক হতে পারে। একবার আমরা এটি রূপায়ণযোগ্য বৃহৎ আকারের মডেল হিসেবে কাবেরী বেসিনে দেখাতে পারলে, অন্য সমস্ত নদীর ক্ষেত্রেও এটি অনুকরণ করা যেতে পারে।