এক চিরনূতন অস্তিত্ব - উপলব্ধি, মন এবং অস্তিত্ব

সদগুরু দেখাচ্ছেন কীভাবে আমরা যখন মনের মাধ্যমে কাজ করি তখনই একমাত্র "পূরাতনের" অস্তিত্ব থাকে। অন্যথায় অস্তিত্বের সবকিছু সর্বদাই নতুন এবং সজীব।
an-ever-new-existence-perception-mind
 

১৯৯৪ সালের 'হোলনেস প্রগ্রামের' এই উদ্ধৃতাংশের মধ্য দিয়ে সদগুরু আলোচনা করছেন কীভাবে যখন আমরা মনের মধ্য দিয়ে কাজ করি কেবল তখনই "পুরাতনের" অস্তিত্ব থাকে। অন্যথায় অস্তিত্বের সবকিছু সর্বদাই নতুন এবং সজীব।

সদগুরু: পুরো অস্তিত্বটা সর্বদাই একেবারে নতুন। প্রতিটি মুহুর্তে আপনি যাকিছু দেখছেন- তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আবার একটা কিছু তৈরী হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ বার এটা ঘটে চলেছে। এই কারণেই গৌতম বুদ্ধ 'অনিত্য' এবং আদি শঙ্করাচার্য 'মায়ার' কথা বলেছিলেন। সবকিছু সত্যিই সবসময় সেখানে নেই। প্রতি সেকেন্ডে সবকিছু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, একসাথে আসছে, বিচ্ছিন্ন হচ্ছে আবার মিলিত হচ্ছে - লক্ষাধিক বার ঘটে চলেছে। অস্তিত্ব সর্বদাই নতুন - এটি কেবলমাত্র এই মুহুর্তেই রয়েছে। এটি সৃষ্টি হয়, বিলীন হয়, আবার সৃষ্টি হয়। পুরো সৃষ্টিই এই নীতির উপর ভিত্তি করে রয়েছে। অস্তিত্বে একমাত্র যে জিনিসটি "পুরানো" কে বয়ে বেড়ায় সেটি হল আপনার মন। আপনি যখন নিজের মনের মধ্য দিয়ে কাজ করেন তখন সমস্ত কিছু - বস্তু এবং মানুষ - পুরানো হয়ে যায়। আপনি যদি সবকিছুকে যেমন আছে তেমনটি দেখেন, তবে সবকিছু সর্বদাই সজীব।

মন এবং স্মৃতি


 

প্রথম দিন যখন অংশগ্রহণকারীরা অনুষ্ঠানের জন্য এসেছিলেন এবং প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হচ্ছিল, কিছুজন ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। তারা সম্ভবত কখনও এই ধরণের বৃষ্টির সংস্পর্শে আসেন নি। বৃষ্টি হলে অনেক মানুষ তাদের ঘর থেকেই বের হননা। এছাড়া শহরের বৃষ্টি আর গ্রামের বৃষ্টির অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। বাইরে সবকিছু আপনার খুব কাছে বলে মনে হয়, এমনকি কয়েক মাইল দূরে বজ্রপাত হলেও...। যখন সত্যিকারের ঝড় হয় তখন বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ থাকুন। এর জন্য প্রচুর পরিমাণ সহ্যশক্তি এবং সাধারণ জ্ঞান লাগে। বেশিরভাগ মানুষই আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন। যখন বজ্রপাত হয় তখন তারা কম্বল দিয়ে নিজেদের ঢেকে রাখেন - যেন কম্বল তাদেরকে বজ্রপাত থেকে বাঁচাবে। যদি এটা আপনার উপর পড়ার হয় তাহলে পড়বেই। কম্বল এটাকে আটকাতে পারবে না - আপনাকে তাহলে আপনার বাড়িতে একটি বাঙ্কার তৈরি করতে হবে।

আপনি যদি একবারের জন্যও অস্তিত্বের দিকে ভালো করে তাকান, সেটাই যথেষ্ট। এর ভেতরে অনেককিছু আছে। আপনি যাকিছু দেখেছেন তা যথেষ্ট হলে তবেই আপনি প্রকৃত অর্থে ধ্যানমগ্ন হতে পারবেন।

হয়তো এই ঝড়বাদল লোকজনের মন দমিয়ে দিয়েছিল। যাই হোক, পরের দিন তারা সকলেই মাথা নিচু করে হাঁটছিলেন। খুব কম লোকই মুখ তুলে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দু-তিন দিন পর তাদের মনমেজাজ ঠিক হয় এবং সকালের দিকে তারা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতেন - সেগুলো কত সুন্দর তা উপভোগ করতেন। দিন দশেক পর তারা আর সেদিকে তাকাতেন না। যেহেতু পাহাড়গুলি সবসময় ওখানেই ছিল, তাদের উপলব্ধিতে সেগুলো পুরোনো হয়ে গেছিলো।

এখানে এমন অনেকেই আছেন যারা একবারও পাহাড়গুলোর দিকে তাকাননি, বা হয়তো হালকাভাবে দেখেছেন। "পাহাড় ... সে তো সবসময়ই ওখানে রয়েছে। সে আর দেখার কি আছে?” ওগুলো তাদের কাছে পুরানো হয়ে গেছে। ওগুলো পুরানো হয়ে যায় নি - এখনও তারা আনকোরা নতুন। আপনি নিজের মনের ছাঁকনির ভেতরদিয়ে সবকিছু দেখেন বলেই আপনার স্মৃতি সমস্ত জিনিসকে পুরানো করে দেয়। এটাই জীবনের অভিশাপ। 'আদম এবং ইভ' যে জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়েছিল - এটা হল সেটাই। ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাছে সবকিছু সজীব এবং চমৎকার ছিল, কিন্তু একবার যখন তারা এই আপেলটি খেল- পৃথিবীটা পুরানো হয়ে গেল। যতক্ষণ আপনার কাছে জিনিসগুলি পুরানো মনে হবে ততক্ষণ আপনার ইচ্ছাগুলি আপনাকে নিরন্তর চালিত করে যাবে। পাগলের মতো আপনি নতুন জিনিস খুঁজতে থাকবেন।

 

 

জেন সম্প্রদায়ের গল্প রয়েছে - তারা নদীর এপারে বাস করতেন এবং নদীর ওপারে ছিল একটি গ্রাম। তারা আলো দেখতে পেতেন; ধোঁয়া দেখতে পেতেন; তারা কথাবার্তা ও চেঁচামেচি শুনতে পেতেন কিন্তু কোন লোকজন দেখতে পেতেন না। তারা জীবন অনুভব করতে পারতেন কিন্তু সেখানে কী ছিল তা তারা ঠিক করে জানতেন না। এই মানুষগুলি নদীর একতীরে কয়েক দশক ধরে বসবাস করলেও অন্যদিকে গিয়ে সেখানে কারা আছে বা কী ঘটছে তা দেখার কথা কখনও ভাবেননি। এর কারণ প্রতিদিন যখন আপনি সকালে ওঠেন, এখানে সবকিছু এত চমৎকার - অন্য কোথাও গিয়ে খোঁজাখুঁজি করার সময় কোথায়? অথচ মানুষ চাঁদে গেছে - তারা মঙ্গল গ্রহেও যেতে চায়। তারা সন্তুষ্ট নয়, কারণ তাদের মনে সবকিছুই পুরানো।

চোখ খুলুন!


 

'কেবলমাত্র একটি দৃষ্টিপাতও যথেষ্ট হতে পারে' - ফরাসি লেখক ও দার্শনিক অ্যালবার্ট ক্যামাস তার একটি বইতে এভাবেই বলেছেন। বুদ্ধিগতভাবে তিনি আত্ম-উপলব্ধির খুব কাছাকাছি এসেছিলেন - এতো কাছে যে তিনি প্রায় উন্মাদ হতে বসেছিলেন। তিনি আত্ম-অনুসন্ধানের অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কেউ যদি তাকে ধ্যান শেখাতেন, তবে তিনি চমৎকার একজন আত্মজ্ঞানী মানুষ হয়ে উঠতেন। কিন্তু তাকে দীক্ষিত করার মতো কেউ ছিল না। তিনি "সিসিফাসের পৌরাণিক কাহিনী" বইটিতে যা বলেছেন তা প্রায় উপনিষদের মতো, গীতার মতো - কেবলমাত্র অভিজ্ঞতালব্ধ নয়, এই যা। বুদ্ধিগত স্তরে তিনি সবকিছু দেখেছিলেন, কিন্তু তার কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। উপলব্ধির খুব কাছাকাছি আসলেও তিনি আত্মজ্ঞান লাভ করতে পারেন নি - তার বৌদ্ধিক চিন্তাভাবনার কারণে এবং সঠিক পরিবেশ ছিল না বলে।

এই বইতে তিনি বলেছেন যে আপনি যদি চোখ খুলে জীবনকে তার মতন করে কয়েক মিনিট দেখেন, তারপর আপনি সারা জীবনের জন্য একটি অন্ধকার কুঠুরিতে বদ্ধ থাকলেও বা আপনার চোখ আর না খুললেও একেবারে ঠিক আছে। এটি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা ছিল - এটি তিনি অনুভব করেছিলেন। এবং এটাই সত্য - আপনি যদি সত্যিই একবার অস্তিত্বের দিকে তাকান, তবে এটিই যথেষ্ট। এর মধ্যে অনেক কিছু রয়েছে। আপনি যা দেখেছেন তা যদি পর্যাপ্ত হয় তবেই আপনি সত্যিকারের ধ্যানমগ্ন হতে পারেন। একবার আকাশের দিকে তাকানোই যথেষ্ট হতে পারে। এমনকি আপনি যদি তারপর অন্ধও হয়ে যান - আকাশের দিকে আপনার ওই এক ঝলক তাকানোই আপনাকে পুরো জীবন ধরে রাখতে পারে, সত্যিই যদি আপনি গ্রহনশীল হন। অন্যথায় সবকিছুই পুরানো হয়ে যায়, কারণ আপনি আপনার সচেতনতার পরিবর্তে আপনার স্মৃতির মধ্য দিয়ে বাঁচেন।

The ebook, Encounter the Enlightened, includes more from the Wholeness Program. Available at Isha Downloads.

Encounter the Enlightened

Editor’s Note: This article is based on an excerpt from the February 2015 issue of Forest Flower. Pay what you want and download. (set ‘0’ for free). Print subscriptions are also available.