সৃষ্টির উৎসকে স্পর্শ করার সাধন

অস্কার জয়ী চিত্র পরিচালক শেখর কাপুর লিঙ্গ-ভৈরবীর প্রকৃতি, যন্ত্র এবং প্রাণ-প্রতিষ্ঠিত স্থানের ব্যাপারে সদগুরুর সাথে আলোচনা করছেন।
Tools to Tap the Source of Creation
 

Oscar award-winning filmmaker Shekhar Kapur speaks to Sadhguru about the nature of Linga Bhairavi, yantras, and consecrated spaces.

শেখর কাপুর: সদগুরু, যখন লিঙ্গ -ভৈরবীর প্রাণ-প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, আপনি বলেছিলেন, "শেখর, একজন সৃজনশীল ব্যাক্তি হিসাবে আপনি অবশ্যই আসবেন।" সুতরাং, আজ আপনাকে আমার প্রথম প্রশ্ন হল ভৈরবী এবং সৃজনশীলতার সম্পর্ক নিয়ে।

সদগুরু: আমরা এই গ্রহে ভৌত সৃষ্টি বলে যা জানি- তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হ'ল মানুষের শরীর। এমন কোন ভৌত প্রক্রিয়া নেই যা এর মতো পরিশীলিত এবং অসাধারণ। আর যদিও এতে পুংলিঙ্গের অবদান আছে, তবুও এটি মূলত স্ত্রী লিঙ্গের গর্ভে তৈরি হয়। ভৈরবী হল সর্বোচ্চ স্ত্রী- প্রকৃতি; সৃজনশীলতা তার নির্যাস।

শেখর কাপুর: আপনি বলছেন- আমার স্ত্রী সুলভ প্রকৃতিই আমার সৃজনশীলতার উৎস?

সদগুরু: আমি বিশ্বাস করি না যে মানুষ সৃজনশীল হতে পারে। আমরা যদি আমাদের চারপাশের সৃষ্টিকে বিশেষ গভীরতার সাথে দেখি, আমরা বিভিন্ন ভাবে এর অনুকরণ করতে পারি- নানারকম বিন্যাস ও সমন্বয়ে এবং তখন সমাজে আমাদের সৃজনশীল বলে মনে হয়, তবে আমরা সত্যিকারের সৃজনশীল নই। যা কিছু তৈরী করা যায় তা ইতিমধ্যেই সৃষ্টিতে সম্পন্ন হয়েছে। সর্বাধিক আমরা কুশলী কারিগর মাত্র। আপনি যদি "সৃজনশীল" শব্দটিকে সত্যিই কিছু সৃষ্টি করা হিসাবে বর্ণনা করেন - তা সে যদি আপনি একটি সিনেমা বানান বা কিছু ছবি আঁকেন বা আমি একটি বাড়ি বানাই বা বক্তৃতা দিই বা আমি যাই করি না কেন- এটা ঠিক সৃজনশীলতা নয়- এটা হল কুশলী "অনুকরণ"। যেহেতু আমরা জীবনের বিভিন্ন দিকে মনোসংযোগ করেছি, আমরা যেভাবে অনুকরণ করতে সক্ষম হয়েছি- তা করা সম্ভব বলে অন্যরা ভাবেই নি। আর আপনার যদি "অনুকরণ" কথাটি ভালো না লাগে তবে বলতে পারেন "পুনরাবৃত্তি".

শেখর কাপুর: আমার "পুনরাবৃত্তির" চেয়ে "অনুকরণ" কথাটি পছন্দ। তবে একজন সৃজনশীল ব্যাক্তি হিসাবে আপনি আমাকে "ব্যাখ্যা" শব্দটি ব্যবহার করতে দিতে পারেন।

সদগুরু: না, আমি আপনাকে "সঞ্চালন" শব্দটি দেব । সঞ্চালন করার মাধ্যমে আপনি রং এবং গঠনের কিছু পরিবর্তন করতে পারেন।

শেখর কাপুর : ঠিক আছে, আমি তাহলে “সৃজনশীলতা” শব্দটি বদলে "সঞ্চালন" করে নিচ্ছি। তাহলে আমরা এখন সঞ্চালন নিয়েই কথা বলি। কিভাবে আমি সঞ্চালন করবো? ভৈরবী আর সঞ্চালন এই দুটির মধ্যে কি কোন সম্পর্ক আছে? আমি কিভাবে সৃষ্টির অংশ হতে পারি বা কিভাবে সৃষ্টিকে উপলব্ধি করতে পারি?

সদগুরু: উনি নিজেই এক সঞ্চালন। আমরা যোগ শাস্ত্রে "জানালা" কথাটি সবসময় ব্যবহার করে থাকি। কোনোভাবে বিল গেটস এটি আমাদের থেকে চুরি করে নিয়ে গেছেন, কারণ আমরা কখনই এটিকে এত জনপ্রিয় করতে পারিনি- যেমনটি তিনি করেছেন। এটি একটি নতুন জানালা খুলে দেবার মতো। আপনি যদি একটি নতুন জানালা খোলেন, হঠাৎ করে সৃষ্টিকে সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগে। মনে করুন আপনি সারাজীবন একটি বাড়ির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থেকেছেন। এখন আপনি যদি একটি জানালা খোলেন- তবে দেখবেন একটি মন্দির, আর ভাববেন পৃথিবীটাই একটি মন্দির। আপনি যদি অন্য একটি জানালা খোলেন, আপনার মনে হবে পৃথিবীটা একটা পর্বত। এইভাবে অন্য আর একটি জানালা খুললে ভাববেন পৃথিবীটা একটি বনভূমি। আরেকটি জানালা খুললে পৃথিবীকে একটি শহর বলে মনে হবে। একই ভাবে আপনি লক্ষ লক্ষ আলাদা জানালা খুলতে পারেন, তবুও এটা একটা নতুন কিছুই হবে; কারণ সৃষ্টির বিশালত্ব এরকমই।

ভৈরবীর মাধ্যমে মানুষ এমন সবকিছু অনুভব করেন, জানতে পারেন এবং অর্জন করতে সক্ষম হন - যা তারা নিজে থেকে কখনই করতে পারতেন না।

ভৈরবী নিজেই একটি জানালা। যেকোন কিছুকেই একটা জানালায় রূপান্তরিত করা যায়, কিন্তু তা করা হয় নি। আমরা একটি জানালা প্রতিষ্ঠা করেছি আর তা খুলে রেখেছি- যাতে করে বহু মানুষ এর মধ্যে দিয়ে দেখতে পান। ভৈরবীর মাধ্যমে মানুষ উপলব্ধি করতে পারেন, জানতে পারেন এবং এমন সবকিছু অর্জন করতে সক্ষম হন- যা তারা নিজে থেকে কখনই করতে পারতেন না। আপনার সেই সমস্ত অসংখ্য মানুষের গল্প শোনা উচিত- যারা প্রতিদিন ভৈরবী যন্ত্রের মাধ্যমে ভৈরবী সাধনা করে চলেছেন - অবিশ্বাস্য! আপনি যদি তাঁকে জানালা হিসাবে ব্যবহার করেন - হঠাৎই আপনার জন্য তিনি এক নতুন মাত্রা খুলে দেবেন, যা দক্ষতা এবং যোগ্যতার এক উন্নত স্তর।

যন্ত্র : শক্তির মেশিন

অন্যভাবে দেখতে গেলে সমস্ত দেবদেবীকেই যন্ত্রের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। একভাবে যন্ত্র একটি মেশিন। "যন্ত্র" শব্দটির প্রকৃত অর্থ হলো "আকার"। একটি মেশিন হল বিভিন্ন আকারের জটিল সংমিশ্রণ। আমরা কেন মেশিন আবিষ্কার করি? মানুষ এখনো পর্যন্ত যে সমস্ত মেশিন তৈরী করেছে তা কেবল আমরা কোন কাজ যে উপায়ে করি তাকে আরও উন্নত করা। যা আমরা ছোট করে করতে পারি - মেশিন সেটাই বড় করে করতে পারে। আমরা হাঁটতে পারি- তাই আমরা বাইসাইকেল তৈরী করেছি। আপনি যদি গাছের মতো স্থবির হতেন, তাহলে বাইসাইকেল এর চিন্তা কক্ষনো আপনার মাথায় আসতো না।

এই যন্ত্রগুলো হল এক ধরনের মেশিন যা সম্পূর্ণ অন্যরকম মাত্রায় কাজ করে। এই মেশিনগুলো হল অভ্যন্তরীন কল্যানের জন্য।

সমস্ত মেশিন- তা সে ফোন হোক, বা বাইসাইকেল, বা কম্পিউটার বা অন্যকিছু ; সবকিছুই আমাদের নিজস্ব ক্ষমতা ও যোগ্যতার এক একটি উন্নত রূপ মাত্র। সেই ভাবে দেখলে ভৈরবী যন্ত্রও একটি মেশিন। তাঁর সাথে কাজ করার ধরণটা অন্য রকম, কারণ তিনি ভৌত মেশিন নন - তিনি শক্তির যন্ত্র। আপনি যদি সঠিক 'কোড' ব্যবহার করেন- যেমন কোন মন্ত্র বা বিশেষ কোন পদ্ধতি তাঁর সাথে সংযুক্ত হওয়ার জন্য এবং তিনি আপনার হয়ে কাজ করেন- হঠাৎ করে বিভিন্ন স্তরে আপনার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

আপনি যখন প্রথম বাইসাইকেল চালানো শিখেছিলেন সে কথা যদি মনে করেন- স্বাধীনতার সেই নতুন মাত্রা ছিল অসাধারণ। একটি বাইসাইকেল হল খুবই সাধারণ একটি মেশিন, কিন্তু যখন প্রথম সেটি চড়তে শেখেন- তখন আপনার স্থানান্তর করার ক্ষমতা এক নতুন মাত্রা পায়, যা অসাধারণ। এই পৃথিবীতে মানুষের আধিপত্যের একমাত্র কারণ হল যে তারা মেশিন আর যন্ত্রপাতি তৈরী করেছে। আপনি কখন একটা চিতার মতো দ্রুত দৌড়াতে পারেন না। আপনি একটি বাঘের সাথে লড়াই করতে পারেন না। একটা হাতির সাথে আপনার কোনো তুলনাই হয় না। আপনি একটা গরু বা ষাঁড়ের সমতুল্যও নন। শুধুমাত্র আমাদের মেশিন আর যন্ত্রপাতির জন্যই আমরা উন্নত জীবন যাপন করি।

বিজ্ঞানের এই ধারা- যা বর্তমান পদার্থ বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি প্রাচীন, অনেক বেশি গভীর এবং অনেক বেশি জটিল- এটি অন্তর্মুখী বিদ্যা।

এই যন্ত্রগুলি হল এক ধরনের মেশিন যা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায় কাজ করে। এরা হল অভ্যন্তরীণ মঙ্গলকারী যন্ত্র। যখনই আমি ধ্যানলিঙ্গকে একটি যন্ত্রের সাথে তুলনা করি, মানুষ মনক্ষুন্ন হন - "সদগুরু, দয়া করে এটিকে যন্ত্র বলবেন না - আমাদের কাছে এটি দেবতা!" আমি বলি, "ঠিক আছে - ভগবানও একটি যন্ত্র"। যখন মানুষেরা মন্দিরে গিয়ে বলেন , "শিব, আমার জন্য এটা করে দাও"। তারা তাঁকে একটা যন্ত্র হিসেবেই নিজের ভালোর জন্য কাজে লাগাতে চাইছেন। মানুষ বোঝে না- যন্ত্র কত ভালো একটা জিনিস। ভগবান অত অসাধারণ নন - যন্ত্র অসাধারণ। ধরুন আমি আপনাকে একটি আসবাবে একটা স্ক্রু খুলতে বললাম - আপনি আপনার সব নখ আর কিছু দাঁতও খোয়াতে পারেন, কিন্তু তবুও ওটা বাইরে আসবে না। আমি আপনাকে একটা ছোট্ট স্ক্রু-ড্রাইভার দিলে - হয়ে যাবে। একটা যন্ত্রের এটিই ক্ষমতা - এটি আপনাকে এমন সব কাজ করতে সক্ষম করবে যা আপনি নিজে থেকে করতে পারতেন না।

আপনি হয়তো আপনার মাথার উপর দাঁড়িয়েছেন, সমস্ত ধরণের উদ্ভট অঙ্গভঙ্গী করেছেন কিন্তু তবুও ধ্যান করতে পারেননি। এখন আপনি যদি ধ্যানলিঙ্গের কাছে এসে বসেন, আপনি এমনিতেই ধ্যানমগ্ন হয়ে উঠবেন। কত কত মানুষ, যারা সারাজীবন ধ্যান করতে পারেননি তারাও এখানে এসে ধ্যানমগ্ন হয়ে গেছেন। এটি খুব শক্তিশালী একটি যন্ত্র ওই লক্ষ্যে - সেই জন্যই এটিকে ধ্যানলিঙ্গ বলা হয়। একইভাবে ভৈরবী এক অন্য মাত্রার কল্যানকারী যন্ত্র। এই ধরণের অতি উন্নত অবয়বের সৃষ্টি করা হয়েছিল - যাতে তা আপনাকে এমন সব জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেটা আপনি নিজে থেকে পারতেন না।

প্রাণ-প্রতিষ্ঠিত জায়গা

আমি যদি ওই ধরণের জায়গায় না পৌঁছোতাম, আমি কিছুতেই ভৈরবীকে এই পর্যায়ে বিকশিত করতে পারতাম না -এখন যেমনটি তিনি আছেন। যদি প্রত্যেককে এই যাত্রাটা কোন যন্ত্র ছাড়াই করতে হত, কোনো মেশিন ছাড়া- এটি অতি কষ্টকর হয়ে উঠতো। মূলত এটা শুধুমাত্র যন্ত্র আর মেশিনের জন্যই সম্ভব যে এক প্রজন্ম যদি কোনকিছু একটি বিশেষ অবস্থায় ছেড়ে যায়, পরবর্তী প্রজন্ম সেখান থেকেই পরের পদক্ষেপ নিতে পারে; আবার প্রথম থেকে শুরু না করে বা আগের ধাপের পুনরাবৃত্তি না করে।

জীবন- আপনার কাছে উপলব্ধি ও অনুভব করার জন্য। এটিকে আরও গভীর ভাবে উপলব্ধি ও অনুভব করার সুযোগ আপনার কাছে রয়েছে।

এই যন্ত্রগুলি খুবই শক্তিশালী মেশিন। এখন ব্যাপারটা এই যে এই ধরণের বিজ্ঞান -যেটা এখনকার ভৌত বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি প্রাচীন, অনেক বেশি গভীর এবং অনেক বেশি জটিল ; কিন্তু প্রকৃতিগত ভাবে অন্তর্মুখী। আজকের বিজ্ঞান কেবলমাত্র ব্রহ্মান্ডের ভৌত প্রকৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বস্তুগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি কেবল জীবনের ব্যাহ্যিক পরিবর্তন আনতে পারেন - আপনি কোন ভাবেই জীবনের গুনগত পরিবর্তন আনতে পারবেন না। ধরুন আপনি সাইক্লিং, দৌড়ানো, শারীরিক কসরৎ বা পেশী বানানোর দৈনন্দিন চেষ্টা শুরু করলেন- তাতে আপনার চেহারা পাল্টে যাবে, সামাজিকভাবেও কিছু বদলাতে পারে; কিন্তু আপনার জীবনের অভিজ্ঞতায় কিছুই বদলাবে না। বড়ো বড়ো পেশী নিয়েও আপনি কষ্টেই থাকবেন - ব্যাস, ঐ পর্যন্তই।

কিন্তু আপনি যদি সেই মাত্রাকে বদলে দেন, যা ভৌত প্রকৃতির উর্দ্ধে ; সমস্তকিছু - আপনি যেভাবে বেঁচে আছেন, যেভাবে জীবনকে উপলব্ধি করছেন, সবকিছু বদলে যাবে। এই ব্রহ্মান্ডের সাথে আপনার মূল সংযোগই পাল্টে যাবে। সর্বোপরি, আপনি জীবনের কোন কিছুই সত্যিকিরের তৈরী করতে পারেন না। জীবন আপনার জন্য উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতা করার বিষয়। আপনার কাছে সুযোগ আছে- এটিকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করার এবং অভিজ্ঞতা নেওয়ার। দুৰ্ভাগ্যবশত, আজকের পৃথিবীতে এই মাত্রাটি সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত; তার কারণ ভৌত প্রকৃতিকে নিয়ে পাগলামো ।

 

 

Editor's note: The next Yantra Ceremony will be held at Isha Yoga Center on July 31, 2019. You will be initiated into a powerful process and receive the Yantra in Sadhguru's presence. For more details, click here or call 844 844 7708.

This article is based on an excerpt from the December 2014 issue of Forest Flower. Pay what you want and download. (set ‘0’ for free). Print subscriptions are also available.