সদগুরু: ভারতে চলতি কথায় "সমাধি" বলতে কবর কিংবা কবরের উপরের স্মৃতিস্তম্ভকে বোঝায়। যখন কাউকে কোনো জায়গায় কবর দেওয়া হয় আর তার উপরে কোনো ধরণের স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়, তখন তাকে সমাধি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে "সমাধি" বলতে মানব সচেতনতার পক্ষে যে সর্বোচ্চ অবস্থায় উপনীত হওয়া সম্ভব সেই অবস্থাটিকেও বোঝায়।   

যখন কেউ মারা যান ও তাঁকে কবর দেওয়া হয়, তখন সেই জায়গাটিকে ওই ব্যক্তিটির নামে নাম দেওয়া হয়। কিন্তু যখন কেউ এক বিশেষ অবস্থা অর্জন করেন এক নির্দিষ্ট স্থানে থেকে, তখন সেই ব্যক্তিটিকে সেই স্থানটির নাম দেওয়া হয়। এইজন্যই আপনি দেখবেন যে বহু যোগীদের নির্দিষ্ট কোনো জায়গার নামে নামকরণ করা হয়েছে। এইভাবেই শ্রী পালানি স্বামী তাঁর নাম পেয়েছিলেন কারণ তিনি পালানি নামক এক জায়গায় সমাধিস্থিত অবস্থায় বসেছিলেন। লোকেরা তাঁকে কেবল পালানি স্বামী বলেই ডাকতেন কারণ তিনি কখনো কাউকে নিজের পরিচয় দেননি। তিনি কখনো কাউকে বলেননি যে তাঁর নাম কী ছিল কারণ তিনি কোনো নাম বয়ে বেড়াতেন না। যেহেতু তিনি সেই জায়গায় সমাধিতে উপনীত হন, তাই লোকে তাঁকে পালানি স্বামী বলে ডাকতেন। বহু যোগী ও মুনি-ঋষিদের এরকম নাম রয়েছে।

সমাধি কী?

সমাধি শব্দটিকে মূলত ভুল বোঝা হয়। লোকে ভাবে সমাধি মানে কোনো মৃত্যুসম অবস্থা। সমাধি শব্দের আক্ষরিক অর্থ সম এবং ধী - সম মানে সমতা এবং ধী মানে বুদ্ধি বা বুদ্ধিমত্তা। আপনি যদি বুদ্ধির এক সমাহিত অবস্থায় পৌঁছোন, সেটা সমাধি বলে পরিচিত।

"সমাধি" শব্দটি এসেছে সম এবং ধী শব্দ দুটি থেকে। সম মানে মনের সমতা, ধী মানে বুদ্ধি। আপনি যদি বুদ্ধির এক সমাহিত অবস্থায় পৌঁছোন, সেটা সমাধি বলে পরিচিত।

বুদ্ধির মৌলিক প্রকৃতি হল প্রভেদ করা - শুধুমাত্র আপনার বুদ্ধিটি কাজ করছে বলেই আপনি একজন ব্যক্তি এবং একটি গাছের মধ্যে প্রভেদ করতে পারেন। টিকে থাকার জন্য এই বৈষম্যমূলক গুণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি কোনো পাথর ভাঙতে চান তবে আপনাকে ঐ পাথরটি আর আপনার আঙুলের মধ্যে প্রভেদ করতে হবে, নইলে আপনি নিজের আঙুলটিকেই ভেঙে বসবেন। বৈষম্য এমন একটি সাধনী যা দেহের প্রতিটি কোষে কোষে উপস্থিত টিকে থাকার সহজাত প্রবৃত্তিকে সহায়তা করে তাকে কার্যকর করে তোলে।

আপনি যদি বুদ্ধিকে অতিক্রম করেন, আপনি সমাহিত হয়ে যান। এর মানে এই নয় যে আপনি প্রভেদ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। আপনি যদি বৈষম্যমূলক বুদ্ধিটি হারিয়ে ফেলেন, তাহলে আপনি পাগল হয়ে যাবেন। সমাধি অবস্থায়, আপনার বৈষম্যমূলক বুদ্ধি একেবারে ঠিকঠাক বজায় থাকে কিন্তু একই সাথে আপনি এটা অতিক্রম করে যান। আপনি কোনো পার্থক্য করছেন না - আপনি কেবল এখানে আছেন,জীবন যেভাবে কাজ করে ঠিক সেভাবেই তাকে দেখছেন। যেই মুহূর্তে আপনি বুদ্ধি ত্যাগ করেন বা অতিক্রম করে যান, বৈষম্যের অস্তিত্ব থাকতে পারে না।

সবকিছু এক হয়ে যায়, যেটা হল বাস্তব। এমন এক অবস্থা আপনাকে অস্তিত্বের একত্ব, যা কিছু আছে সমস্ত কিছুর একীকরণের এক অভিজ্ঞতা প্রদান করে।

আধ্যাত্মিকতার সমগ্র আঙ্গিকটাই হল এই বৈষম্য এবং টিকে থাকার সহজাত প্রবৃত্তিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে, যেগুলো শুধুমাত্র জীবনের ভৌতিকতার জন্যই অভিপ্রেত। সমাধি হল সমতার এক অবস্থা যেখানে বুদ্ধি তার প্রভেদ করার স্বাভাবিক কাজটাকে ছাড়িয়ে যায়। এটা ক্রমে, একজনকে তার ভৌত শরীর থেকে আলগা করে দেয়। আপনি যা এবং আপনার শরীর যা তার মাঝখানে একটি স্থান তৈরি হয়।

এই অবস্থায়, কোনো সময় বা স্থান নেই। সময় এবং স্থান আপনার মনের সৃষ্টি। একবার যেই আপনি মনকে সীমাবদ্ধতা হিসাবে অতিক্রম করে যান,আপনার জন্য সময় আর স্থানের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। যা এখানে সেটাই ওখানে, যা এখন তাই তখন, আপনার জন্য কোনো অতীত বা ভবিষ্যৎ নেই। সব কিছুই এখানে, এই মুহূর্তে। আপনি হয়তো মনে করেন যে কেউ তিন দিন যাবৎ সমাধিতে রয়েছেন, কিন্তু তাঁদের জন্য, এটা কয়েক মুহূর্ত মাত্র - এভাবেই কেটে যায়। তাঁরা যা কিছু এবং যা কিছু নয় সেই দ্বৈততাকে পার করে গেছেন। তাঁরা সীমানা পেরিয়ে আস্বাদন করেছেন যা কিছু নয় তাকে - যার কোনো রূপ, গুণ, আকৃতি, বৈশিষ্ট্য - কিছু নেই।

বুদ্ধি যতক্ষণ থাকে কেবল ততক্ষণই সমগ্র অস্তিত্ব, সৃষ্টির বিভিন্ন রূপ উপস্থিত। যেই মুহূর্তে আপনি আপনার বুদ্ধির বিলুপ্তি ঘটান, সবকিছু একের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।

সেটা-যা কিছু নয়

অস্তিত্ব "যা কিছু" এবং "সেটা-যা কিছু নয়" দিয়ে তৈরি। "যা কিছু" তার রূপ, গুণ, আকৃতি, সৌন্দর্য রয়েছে। "যা কিছু নয়" তার এসব কিছু নেই, তবে এটি মুক্ত। এখানে ওখানে, "যা কিছু নয়" তা "যা কিছুর" মধ্য দিয়ে অঙ্কুরিত হয়। আর "যা কিছু" যতই আরো সচেতন হয়ে উঠতে থাকে, ততই এটি "যা কিছু নয়" হয়ে ওঠার জন্য আকুল হয়ে ওঠে। যদিও একজন এর সাথে জড়িত রূপ, গুণ, বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকেন, তবুও সত্তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতার এক অবস্থায় উপনীত হওয়ার আকুলতা অনিবার্য এবং অপরিহার্য। এটা কেবল সময়ের ব্যাপার আর সময় ও স্থানের বন্ধনও "যা কিছু" কেবল তারই মায়া। “সেটা-যা কিছু নয়” তা সময় বা স্থান কোনোকিছুই টের পায় না কারণ এটি সীমাহীন ও চিরন্তন, সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার দ্বারা শৃঙ্খলিত নয়।

যখন অস্তিত্বের একেবারে ভিত্তিগত প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত হওয়ার এই আকাঙ্ক্ষার উদয় হয়, তখন মন ও আবেগের ভীতিপ্রদ প্রকৃতি এটাকে কেবলমাত্র আত্ম-বিনাশ রূপেই বোধ করতে পারে। একটি চিন্তাশীল মনের জন্য, আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃত আত্মহত্যা ছাড়া কিছুই নয়। তবে এটি আত্মহত্যা নয় - এটি তার চেয়ে আরো বেশি কিছু। আত্মহত্যা নিজেকে শেষ করতে চাওয়ার একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র উপায়। আমি ক্ষুদ্র বলি কারণ এটি ব্যর্থ থেকে যায়। এটি কাজ করে না। তবে এই সংস্কৃতিতে, এমন মানুষজন আছেন যাঁরা এটি সত্যিই যেভাবে কাজ করবে সেভাবে করার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ- এটি একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া।

আট প্রকারের সমাধি

সমাধি বিভিন্ন প্রকারের হয়। আপনি যখন দেহে থাকেন, আট প্রকারের সমাধি একজন মানুষের কাছে উপলব্ধ থাকে। এই আটটিকে মোটের ওপর শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে সবিকল্প হিসেবে : বৈশিষ্ট্য বা গুণ সহ সমাধি যেগুলি অত্যন্ত মনোরম, আনন্দময় ও পরমানন্দময়; আর নির্বিকল্প হিসেবে: যেই সমাধিগুলি মনোরম বা অপ্রীতিকর অনুভূতির উর্ধ্বে - এদের কোনো বৈশিষ্ট্য বা গুণ নেই।

উপলব্ধির প্রেক্ষিতে সমাধির নিজের কোনো গভীর তাৎপর্য নেই।

যাঁরা নির্বিকল্প সমাধি অবস্থায় যান তাঁদের সবসময় সুরক্ষিত আবহে রাখা হয় কারণ শরীরের সাথে তাঁদের যোগাযোগ খুব যৎসামান্য হয়ে যায়। ছোটখাটো কোনো ব্যাঘাত যেমন একটি শব্দ বা একটি পিনের খোঁচা, শরীর থেকে তাঁদের সরিয়ে দিতে পারে। আপনি এবং আপনার শরীরের মধ্যে পার্থক্য স্থাপন করার জন্য এই অবস্থাগুলি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বজায় রাখা হয়। একজনের আধ্যাত্মিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কিন্তু তাও চূড়ান্ত নয়।উপলব্ধির প্রেক্ষিতে সমাধির নিজের কোনো গভীর তাৎপর্য নেই।

গৌতম বুদ্ধের বহু শিষ্যরা দীর্ঘ ধ্যান করেছিলেন। তাঁরা বছরের পর বছর ধ্যান থেকে ওঠেননি।কিন্তু গৌতম নিজে কখনও তা করেননি কারণ তিনি দেখেছিলেন যে এটি প্রয়োজনীয় নয়। তিনি তাঁর আলোকপ্রাপ্তির আগে এই আট ধরণের সমাধির সবগুলি অভ্যাস করে অভিজ্ঞতা লাভ করে সেগুলি বাতিল করে দেন। তিনি দেখেন যে এটি তাঁকে উপলব্ধির কাছাকাছি কোথাও নিয়ে যাবে না। এটি কেবল অভিজ্ঞতার একটি উচ্চ স্তরে যাওয়া আর সম্ভবত আপনি আরো জড়িয়ে পড়তে পারেন কারণ এটি বর্তমান বাস্তবতার চেয়ে আরো সুন্দর। অন্তত এখন যখন আপনি ধ্যান করেন, বর্তমানের বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আপনার পায়ের ব্যথাটা থাকে। ওখানে, আপনাকে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ব্যথা নেই, যা একরকমভাবে অধিক বিপজ্জনক।

একটি অস্থায়ী অবস্থা

কোনো নির্দিষ্ট ধরণের সমাধির অভিজ্ঞতা লাভের মানে এই নয় যে আপনি অস্তিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে গেছেন। এটি শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার একটি নতুন পর্যায়। এটি এরকম যে যখন আপনি শিশু ছিলেন, তখন আপনার এক স্তরের অভিজ্ঞতা ছিল। যেই আপনি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠেন, আপনার অন্য স্তরের অভিজ্ঞতা হয়। আপনার জীবনের নানা সন্ধিক্ষণে আপনি একই জিনিসকে একেবারে আলাদা আলাদাভাবে উপলব্ধি করেন - আপনি অভিজ্ঞতার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে পদার্পণ করেন। সমাধিও ঠিক এইরকম। আপনি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীরতর অর্থে অভিজ্ঞতার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যান, কিন্তু তাও, এটি শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার এক অন্য স্তর।

কেউ হয়তো সমাধির একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় গিয়ে বছরের পর বছর ধরে সেখানে থেকে যেতে পারেন কারণ এটি উপভোগ্য। সেখানে কোনো স্থান বা সময় নেই। সেখানে কোনো শারীরিক সমস্যা নেই। তিনি শারীরিক ও মানসিক বাধা কিছুদূর অবধি ভেঙে ফেলেছেন। তবে এটি কেবল অস্থায়ী। যেই মুহূর্তে তিনি উঠে আসেন, আবার তিনি ক্ষুধার্ত হন, আবার তাঁকে ঘুমোতে হয় আর সবকিছু আবার ফিরে আসে।

সমাধির উপকারিতা অবশ্যই আছে। একজন ব্যক্তিকে প্রদান করার মতো এর অনেক কিছুই আছে কিন্তু এটি সত্যিই আপনাকে উপলব্ধির কাছাকাছি কোথাও নিয়ে যায় না। একজন সংযত মানুষের তুলনায় একজন সামান্য নেশাগ্রস্ত মানুষ আলাদা স্তরের অভিজ্ঞতায় থাকে, কিন্তু তাকে কোনো একটি সময় নেমে আসতে হয়। সকল সমাধিই, আমি বলবো, বাহ্যিক কোনো রাসায়নিক ছাড়া নেশাগ্রস্ত হওয়ার একটি উপায়। এইরকম স্থিতিতে গেলে, এটি আপনার জন্য একটি নতুন মাত্রা উন্মুক্ত করে, তবে এটি কোনও বৃহৎ রূপান্তরের দাগ রাখে না। এটি আপনাকে স্থায়ীভাবে রূপান্তরিত করে না। আপনি অন্য কোনো বাস্তবতায় স্থানান্তরিত হন না। শুধুমাত্র এই যা একই বাস্তবতায় আপনার অভিজ্ঞতার স্তরটি আরও গভীর হয়েছে। আপনি একই জিনিসকে আরো গভীরভাবে অনুভব করেছেন। আপনি মন থেকে মুক্ত হননি।

আপনার নিজেরই জগতে আটকা পড়া

অনেক যোগী তাঁদের নিজস্ব জগৎ তৈরি করে এইরকম বাস্তবতার মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন। আমি এমন একটি প্রসঙ্গে যাচ্ছি যা একটি গোধূলি এলাকা, তবে এমন অনেক যোগী আছেন যাঁরা নিজেদের চারপাশে তাঁদের নিজস্ব জগৎ তৈরি করেছেন। একজন যোগী একটি গুহায় গিয়ে প্রকৃতই নিজের ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে সেখানে বাস করেন। এটি কোনো মশকরা না। তিনি যা চান সেই সবকিছু সৃষ্টি করেন - তাঁর নিজস্ব গ্রহ, তাঁর নিজস্ব পৃথিবী, তাঁর নিজস্ব সবকিছু - আর সেখানে খুব সুখে বসবাস করেন। একটি ব্রহ্মাণ্ড গুহার ভিতরে ধারণ করা থাকে। আপনি একটি পরমাণুর স্থানে একটা গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করতে পারেন কারণ "এখানে ও ওখানে" আর "এইটুকু ও ওইটুকু" হল মনের এক সৃষ্টি।

এরকম অনেক যোগী রয়েছেন, তবে উপলব্ধির দিক থেকে তাঁরা আপনার চেয়ে বেশি কাছাকাছি নন। তিনি একটি আলাদা পৃথিবীতে বাস করেন, এই যা। সম্ভবত তিনি আপনার চেয়ে বেশি জড়িয়ে আছেন, কারণ তিনি স্রষ্টাও। তিনি সৃষ্টির কলাকৌশলটি শিখেছেন। এটি চূড়ান্ত মুক্তি হয়ে ওঠে না। এটি কেবল একটি ভিন্ন ধরণের কর্মে পরিণত হয়, নানা জিনিসপত্র করার একটি ভিন্ন উপায়।

একজন শিল্পী ক্যানভাসে একটি নতুন পৃথিবী আঁকেন। একজন যোগী সেটা আসলেই তৈরি করেন। শিল্পীর সৃষ্টি দ্বি-মাত্রিক, যেখানে যোগীর সৃষ্টি ত্রি-মাত্রিক। এটি আরও প্রতারণামূলক। একজন শিল্পী যেই জগৎ তিনি সৃষ্টি করেন সেই জগতে এতটাই লিপ্ত হয়ে যেতে পারেন যে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন এটাই সত্য আর তাঁর জন্য এটি সত্যিও। একজন কবি বিশ্বাস করেন যে তিনি যা কিছু লেখেন তা সত্য। একইভাবে, একজন চিত্রশিল্পী যা করছেন তার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে গিয়ে বিশ্বাস করেন যে, যে ছবি তিনি আঁকছেন সেটাই সত্য। দ্বি-মাত্রিক জিনিসগুলিই যখন এরকম হয়, তখন আপনি যদি নিজের চারপাশে ত্রি-মাত্রিক জিনিসগুলি সৃষ্টি করেন, আপনি অবশ্যই সেগুলির সাথে আরো বেশি করে জড়িয়ে পড়বেন।

লক্ষ্য স্থির করা

যখন আপনি নিজের চৈতন্যকে অতিক্রম করতে চান, তখন আপনার কাছে যা আছে তার প্রতিটি কণা আপনার দরকার। নানান স্তরে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি আপনাকে মুক্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে না। বহু মানুষকে সমাধি স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি আমাদের রয়েছে। আপনি যদি এভাবে তিন মাস বা ছ'মাস কাটাতে চান, এটি সম্ভব,কিন্তু উদ্দেশ্যটি কী? এটি বিলীন হয়ে যাওয়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় না। এটি কেবল আর এক ধরণের কর্ম।

যদি লক্ষ্যটি স্থির হয়ে গিয়ে থাকে, যদি আপনি উপলব্ধিকেই আপনার জীবনে শীর্ষস্থানীয় করে তুলে থাকেন, তবে কোনোকিছু আপনাকে এর এক পা কাছে নিয়ে না গেলে তা অর্থহীন। যেই মানুষটি মাউন্ট এভারেস্টে উঠতে চান ভীষণ প্রয়োজনীয় না হলে পাশের দিকে এক পাও বাড়াবেন না। তাঁর শক্তির প্রতিটি কণা কেবল শীর্ষে আরোহণের খাতেই ব্যয় হয়। আপনি যখন নিজের চৈতন্যকে অতিক্রম করতে চান, আপনার যা আছে তার প্রতিটি কণা আপনার প্রয়োজন।

মহাসমাধি

মহাসমাধি হল এমন একটি মাত্রা যেখানে আপনি বৈষম্যকে অতিক্রম করেন - কেবল অভিজ্ঞতার দিক দিয়েই নয়, অস্তিত্বগত ভাবেও।

আপনি যতক্ষণ শরীরের মধ্যে থাকেন, যেই মুক্তিই আপনি পান না কেন, শরীর একটি সীমাবদ্ধতা। এটি পুরোপুরি মুক্তি নয়। যখন কেউ সম্পূর্ণ সচেতনতায় তাঁদের শরীর ত্যাগ করেন, তখন আমরা তাকে মহাসমাধি বলি কারণ তিনি শরীরটি ত্যাগ করে গেছেন।

মহাসমাধি হল এমন একটি মাত্রা যেখানে আপনি বৈষম্যকে অতিক্রম করেন - কেবল অভিজ্ঞতার দিক দিয়েই নয়, অস্তিত্বগতভাবেও। আপনি এবং অন্যরা বলে কোনো জিনিস নেই। এই মুহূর্তে, আপনি এবং অন্যরা আছেন; এটি বাস্তবতার একটি নির্দিষ্ট স্তর। সমাধি অবস্থায়, আপনি এই বৈষম্যের উর্ধ্বে চলে যান আর আপনার অভিজ্ঞতায় আপনি অস্তিত্বের অখণ্ডতা দেখতে সক্ষম হন।

মহাসমাধি মানে আপনি এটিকে কেবল দেখছেন না এভাবে, আপনি হয়ে গেছেন সেইরকমই সম্পূর্ণরূপে- বৈষম্যের অবসান ঘটেছে। তার মানে স্বতন্ত্র অস্তিত্বের অবসান ঘটেছে। আপনি কে এখন আর তার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই মুহূর্তে যেই জীবনটি একটি স্বতন্ত্র জীবন রূপে কাজ করে চলেছে তা একেবারে সর্বজনীন বা মহাজাগতিক বা সীমাহীন হয়ে ওঠে। পরম্পরাগত ভাষায় বলতে গেলে, আপনি ঈশ্বরের সাথে এক হয়ে যান বা সমস্ত কিছুর সাথে এক হয়ে যান।

যখন আমি "ঈশ্বরের সাথে এক" হওয়ার কথা বলি, এর মানে কোথাও গিয়ে কারোর সাথে মিলিত হওয়া নয়। শুধু এটাই যে আপনার স্বতন্ত্র বুদ্বুদটি শেষ হয়ে গেছে। উপমা স্বরূপ বলা যায়, এই মুহূর্তে আপনার অস্তিত্ব একটি বুদ্বুদের মতো। যেই বুদ্বুদটি চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে তা খুবই বাস্তবিক তবে আপনি যদি এটিকে ফাটিয়ে দেন তাহলে বুদ্বুদের ভিতরের বাতাসটি কোথায় যায়? এটি শুধু বায়ুমণ্ডলের সাথে এক হয়ে যায়। এটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। যখন আমরা "সমস্ত কিছুর সাথে এক" হওয়ার কথা বলি, এর মানে এটাই। কিছুই থাকবে না। "আপনি" আর থাকবেন না। যখন আমরা মুক্তির কথা বলি, এর মানে আপনি অস্তিত্ব থেকে মুক্ত। আমি অস্তিত্বকে একটি পরিমাণ হিসাবে বলছি না যার থেকে আপনি মুক্ত। আপনি নিজের অস্তিত্ব থেকে মুক্ত - আপনার অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেছে।

নির্বাণ - অস্তিত্বের উর্ধ্বে চলে যাওয়া

মহাসমাধি হল এমন একটি স্তর যেখানে একজন স্বেচ্ছায় শরীরটা ত্যাগ করেন। চক্রটি শেষ হয়ে গেছে। সেখানে আর পুনর্জন্মের প্রশ্নই আসে না; এটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়া। আপনি বলতে পারেন যে এই ব্যক্তিটি সত্যিই আর নেই।

আমরা যখন মুক্তি বা নির্বাণ বা মোক্ষ বলি, এর মানে হল এই যে - অস্তিত্বের একান্ত বোঝাটি থেকে মুক্তি। সেটাই চূড়ান্ত স্বাধীনতা কারণ যতক্ষণ আপনার অস্তিত্ব থাকে, আপনি কোনো না কোনোভাবে আবদ্ধ থাকেন। আপনি যদি ভৌতভাবে উপস্থিত থাকেন, এটি এক ধরণের বন্ধন। আপনি যদি ভৌত শরীরটি ত্যাগ করে অন্য কোনোভাবে উপস্থিত থাকেন তবুও অন্য ধরণের বন্ধন রয়েছে। যা কিছুরই অস্তিত্ব আছে তা কোনো না কোনো আইন দ্বারা চালিত। মুক্তি মানে আপনি সমস্ত আইন ভেঙে ফেলেছেন আর কেবল তখনই সমস্ত আইন ভাঙতে পারা যায় যখন আপনার অস্তিত্ব স্থগিত হয়ে যায়।

নির্বাণ শব্দটি বেশি যথাযথ কারণ নির্বাণ মানে "অনস্তিত্ব"। যখন কোনো অস্তিত্ব থাকে না, এমনকি আপনি স্বাধীনতা থেকেও মুক্ত কারণ স্বাধীনতাও নির্দিষ্ট একটি বন্ধন। সুতরাং আপনার একান্ত অস্তিত্ব থেকে আপনি মুক্ত। আপনি কী এবং আপনি কী নয়- এর মধ্যেকার সমস্ত বৈষম্য শেষ।

এই জীবন গ্রহণ এবং শরীরের কোনোরকম ক্ষতি না করে সেটাকে ছুঁড়ে ফেলা - এটি করতে সক্ষম হওয়ার জন্য প্রচণ্ড শক্তির দরকার। মহাসমাধি হল এমন একটি স্তর যেখানে একজন স্বেচ্ছায় শরীরটা ত্যাগ করেন। চক্রটি শেষ হয়ে গেছে। সেখানে আর পুনর্জন্মের প্রশ্নই আসে না; এটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়া। আপনি বলতে পারেন যে এই ব্যক্তিটি সত্যিই আর নেই।

জীবন কেবল এক স্তর থেকে অন্য স্তরে স্থানান্তরিত হয়। বাস্তবে, মৃত্যু বলে কিছু হয় না। যাঁর জীবন সম্পর্কে কোনো সচেতনতা নেই কেবল তাঁর জন্যই মৃত্যুর অস্তিত্ব রয়েছে। একমাত্র জীবনই আছে, জীবন এবং শুধুমাত্র জীবন। কিন্তু মহাসমাধি মানে প্রকৃত সমাপ্তি। প্রতিটি আধ্যাত্মিক সাধকেরই এটি লক্ষ্য। পরিণামে, তিনি অস্তিত্বের উর্ধ্বে যেতে চান।

 

Editor’s Note: Find out what Sadhguru has to say about the Mystical dimension in Mystics and Mistakes.