নির্বাণ লাভের এক পথ – একটি জেন্ কাহিনী

অনেক আধ্যাত্মিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী যাঁরা নির্বাণের বা মুক্তির পথ অন্বেষণ করছেন, তারা শেষপর্যন্ত এসে ঘুরপাক খান নানা বৃত্তপথে অথচ নির্বাণের পথ রয়েছে প্রত্যেকের ঠিক সমুখেই।
নির্বাণ লাভের এক পথ – একটি জেন্ কাহিনী
 

সদগুরু: একসময় নির্বাণলাভ এবং পরমানন্দ উপভোগ করতে প্রবল আকাঙ্ক্ষী এক যুবক ছিলেন। তিনি অনেকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন " নির্বাণ লাভের পথ কি?"

যাঁরা এই প্রশ্ন শুনতেন প্রত্যেকেই তাকে বলতেন,"সব রাস্তাই নিয়ে যায় বুদ্ধের দেশে, কিন্তু একটা রাস্তা আছে যা সরাসরি নির্বাণের দ্বারে পৌঁছে দেয়। একমাত্র ওই নির্দিষ্ট জেন্ ধর্মগুরুই সেই পথ সম্পর্কে জানেন। ওনার কাছে যান, উনি আপনাকে পথ দেখাবেন।" তাঁরা এক খুব বিখ্যাত জেন ধর্মগুরুর নাম বললেন আর তাঁকে ওনার মঠে যেতে বললেন।

যুবকটি মঠে পৌঁছে ধর্মগুরুর পায়ে গিয়ে পড়লেন।

তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে বললেন ,"হে প্রভু! আপনার পায়ে নিজেকে সমর্পণ করলাম। দয়া করে আমাকে পথ দেখান।"

প্রভু বললেন," সেটা তো এই প্রাঙ্গণের ঠিক বাইরে ।"

শিষ্যটি ভাবলেন, হয়তো প্রভু তাঁর প্রশ্ন ঠিকমতো বুঝতে পারেননি।

তিনি বললেন,"প্রভু, আমি এই প্রাঙ্গনের বাইরের রাস্তার কথা জিজ্ঞাসা করছি না। আমি পরম পথের সন্ধান করছি।"

"ও, সেটা? এটা সেই একই পথ যা কিনা রাজধানীর দিকে যায় । তুমি তা জানো না ?"

"ওইটা নয়, প্রভু। যেখানেই আমি জিজ্ঞাসা করছি মানুষজন আমাকে বলছে যে সব পথই গিয়ে মিলেছে বুদ্ধের রাজ্যে, কিন্তু একটা পথ আছে যা সরাসরি পৌঁছায়ে নির্বাণের দ্বারে এবং এটাও বলছে যে আপনি সেই পথের সম্পর্কে অবগত। আমি জানতে চাই যে সেই পথ কোথায়।"

" ও, ওই পথ? সে তো ঠিক এখানেই," শিষ্য যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই জায়গাটার দিকে ইঙ্গিত করে প্রভু বললেন।

সদগুরুর ব্যাখ্যা:

আপনি যদি মুক্তি চান এক ইঞ্চিও আপনার জায়গা থেকে না সরে, আপনি কিভাবে এটি পাবেন?

আপনি নির্বাণ লাভ করতে চান কিংবা মুম্বাই যেতে চান, যাত্রা কোথা থেকে শুরু হতে পারে ? আপনি এই মুহূর্তে যেখানে আছেন সেখান থেকেই কেবল শুরু হতে পারে। তার বদলে, আপনি যদি কল্পনা করেন যে মুক্তির পথ অন্য কোথাও থেকে শুরু হচ্ছে, আপনি সেই ভ্রমে হারিয়ে যাবেন। যাত্রা যে ধরনেরই হোক না কেন,আপনি এই মুহূর্তে যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, শুধুমাত্র সেখান থেকেই শুরু করতে পারেন।

হাজার হাজার বছর ধরে এই গ্রহে বসবাস করা সত্ত্বেও মানুষ নিজের অভ্যন্তরে বিবর্তিত হতে পারেনি তার কারণ হল তারা এই ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। একজন গুহামানব যেভাবে রেগে যেত, আজও আমরা একই ভাবে রেগে যাই। বাইরের পরিস্থিতি এবং অস্ত্রগুলি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, তবে মৌলিকভাবটা এখনও একই রকম আছে।

রাগের ফলে যে কত দুর্দশা, কদর্যতা এবং দুঃখের উতপত্তি হয়, তার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সত্বেও আমরা উপলব্ধি করতে পারিনি যে কিভাবে এই তুচ্ছ আবেগের ঊর্ধ্বে ওঠা যায়। কেন আমরা এইরকম অবস্থার মধ্যে রয়েছি? শুধুমাত্র এই কারণে যে আমরা এই মুহূর্তে যে জায়গায় আছি তার থেকে সরে যাবার জন্য প্রস্তুত নই। আপনি যদি নিজের জায়গা থেকে এক ইঞ্চিও না সরে, মুক্তির আশা করেন,কিভাবে তা পাবেন? আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি সেটা না দেখেই যদি আমরা পরবর্তী রাস্তা থেকে শুরু করার পরিকল্পনা করি, তবে সে যাত্রা ঘটবে না। আপনি নিজের কল্পনার জগতে ঘুরপাক খেতে থাকবেন।

শুধুমাত্র যদি আমরা যেখানে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিই এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তারও পরবর্তী পদক্ষেপ, তবে এক যাত্রা হতে পারে।

জেন্ ধর্মগুরু যুবকটিকে কেবল এই ইঙ্গিতই দিচ্ছিলেন।

 
 
 
 
  0 Comments
 
 
Login / to join the conversation1