মন্ত্র – রূপান্তরের অনুঘটক

মন্ত্র কী, সমগ্র সৃষ্টির গভীরতর মাত্রার সঙ্গে মন্ত্রের মাধ্যমে কীভাবে সম্বন্ধিত হওয়া যায় সে বিষয়ে বিশ্লেষণ করছেন সদগুরু। “বৈরাগ্য” নিয়ে, যা কিনা পাঁচটি পবিত্র মন্ত্রের সমাহার এবং সেগুলির মাধ্যমে কীভাবে একজন উপকৃত হতে পারেন, সেই বিষয়েও আলোকপাত করেছেন তিনি।
মন্ত্র – রূপান্তরের অনুঘটক
 

মন্ত্র কী, সমগ্র সৃষ্টির গভীরতর মাত্রার সঙ্গে মন্ত্রের মাধ্যমে কীভাবে সম্বন্ধিত হওয়া যায় সে বিষয়ে বিশ্লেষণ করছেন সদগুরু। “বৈরাগ্য” নিয়ে, যা কিনা পাঁচটি পবিত্র মন্ত্রের সমাহার এবং সেগুলির মাধ্যমে কীভাবে একজন উপকৃত হতে পারেন, সেই বিষয়েও আলোকপাত করেছেন তিনি।

সদগুরু: মন্ত্রের অর্থ হল একটি নির্দিষ্ট প্রকরণের মাধ্যমে উৎসারিত ধ্বনি। বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞানের চোখে সমগ্র সৃষ্টি হল শক্তির অনুরণন জাত ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার স্পন্দন। যেখানে স্পন্দন হয়, আবশ্যিক ভাবেই সেখানে ধ্বনির উৎসারণ ঘটবেই। সুতরাং, এ কথার অর্থ হল, সমগ্র সৃষ্টিই একটি নির্দিষ্ট প্রকার ধ্বনি বা অগণিত ধ্বনির এক জটিল সংমিশ্রণ – সমগ্র সৃষ্টিই অসংখ্য মন্ত্রের এক সংমিশ্রণ। এই বিপুল ধ্বনি বা মন্ত্র রাজির মধ্যে মাত্র কয়েকটি ধ্বনি বা মন্ত্র এমনভাবে চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলি চাবিকাঠির মতো হয়ে উঠতে পারে। যদি তুমি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সেগুলিকে ব্যবহার করো, সেগুলি জীবনের ভিন্নতর মাত্রাকে উন্মুক্ত করা এবং নিজের ভিতরে অনুভবের চাবিকাঠি হয়ে ওঠে।

মন্ত্র – সৃষ্টির চাবিকাঠি হয়ে ওঠা

তুমি যা উচ্চারণ করো সেটিই মন্ত্র নয়। মন্ত্র হল সেটিই যার মধ্যে দিয়ে তুমি মূর্ত হয়ে ওঠার চেষ্টা করো কারণ, তুমি মন্ত্রে মূর্ত চাবিকাঠি হয়ে উঠতে না পারলে, সৃষ্টির দ্বার উন্মোচিত হবে না তোমার জন্য। মন্ত্রে মূর্ত হয়ে ওঠার অর্থ হল, তুমি নিজেই চাবিকাঠি হয়ে উঠছো। শুধুমাত্র যদি চাবিকাঠি হয়ে ওঠো, তালাটি উন্মুক্ত করতে পারবে। অন্যথায়, অন্য কোনও ব্যক্তিকে তোমার জন্য এটিকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং তোমাকে তার কথা শুনতে হবে।

প্রস্তুতির অতীব সুন্দর পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে মন্ত্র। কোনও একটি মাত্র মন্ত্রই মানুষের জীবনে এরকম অনন্য সাধারণ কিছু ঘটাতে পারে। কোনও কিছুকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে সেগুলি কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে কিন্তু একমাত্র যদি সেই প্রকারের উৎস থেকেই আসে যেখানে “সমগ্র ধ্বনিময়তার” (“All that is sound”) পরিপূর্ণ বোধটি বিদ্যমান। আমরা যখন এই “সমগ্র ধ্বনিময়তার” কথা বলি, তখন সম্পূর্ণ সৃষ্টিকেই আমরা নির্দেশ করে থাকি। কোনও মন্ত্র যদি এহেন উৎস থেকে আসে, সেই প্রয়োজনীয় বোধকে সঙ্গী করে এবং সম্প্রেরণ যখন বিশুদ্ধ হয়, তখনই মন্ত্র কার্যকরী শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

মন্ত্রের দিকে সচেতনভাবে এগিয়ে যাওয়া

বিভিন্ন প্রকারের মন্ত্র বিদ্যমান। প্রতিটি মন্ত্র মানব শরীরের বিভিন্ন অংশে কোনও নির্দিষ্ট প্রকার শক্তিকে উদ্দীপীত করে। এই বিষয়ে সম্যক ভাবে অবহিত না হয়ে শুধুমাত্র কোনও একটি ধ্বনির পুনরাবৃত্তি মনের মধ্যে একঘেঁয়েমির জন্ম দেয়। কিন্তু যখন যথার্থ সচেতনতার সঙ্গে, এটির প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত হয়ে সেটি উচ্চারিত হয়, একটি মন্ত্র অতীব শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞান হিসেবে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী মাত্রা, কিন্তু যদি যথার্থ ভিত্তি ও প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি না করে এটিকে প্রদান করা হয়, তাহলে এটি প্রভূত ক্ষতি সাধন করতে পারে তার কারণ, এটি হল আত্মগত (subjective) বিজ্ঞান। আমরা এরকম মানুষকেও জানি, যারা গায়ত্রী মন্ত্রের মতো অতি প্রচলতি একটি মন্ত্রের বেঠিক উচ্চারণের ফলে নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছেন।

মন্ত্র ও সংস্কৃত ভাষার সম্পর্ক

মন্ত্র সর্বদাই এসেছে সংস্কৃত ভাষার ভিত্তি থেকে এবং মৌলিক চরিত্রে সংস্কৃত ভাষাটি ধ্বনির প্রতি এতটাই সংবেদনশীল। কিন্তু বিভিন্ন মানুষ যখন কথা বলেন, প্রত্যেকেই তারা নিজেদের মতো করে বলেন। বাংলাভাষী মানুষ যখন মন্ত্রটি বলেন, তারা তাদের নিজেদের মতো করেই বলেন। তামিলভাষী মানুষরা যদি সেটিকে বলেন, তারা ভিন্নভাবে সেটিকে উচ্চারণ করেন। যদি আমেরিকাবাসী মানুষজন সেটিকে বলেন, তারা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সেটিকে উচ্চারণ করেন। এভাবেই বিভিন্ন মানুষ, যারা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, কোন ধরনের ভাষার সাথে তারা অভ্যস্থ, তার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন মন্ত্রকে বিকৃত করার প্রবণতা দেখান, যতক্ষণ না তাদের প্রকৃত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণগুলি অতীব পুঙ্খানুপুঙ্খ হয় এবং বর্তমান সময়ের মানুষদের সেই পরিমাণ ধৈর্য্য ও অধ্যাবসায় থাকে না তার কারণ, এর জন্য যঠেষ্ট পরিমাণ সময় ও একাত্মতার প্রয়োজন হয়।

নাদযোগ – ধ্বনি ও অবয়বের সংশ্লেষ

সংস্কৃত ভাষাটি একটি যন্ত্র সুলভ, মূলগত ভাবেই পারস্পরিক আদান প্রদানের মাধ্যম নয়। অন্যান্য অধিকাংশ ভাষাগুলিকে তৈরি করা হয়েছে কারণ, আমাদের কোনও কিছুর প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হতো। প্রাথমিক ভাবে গুটিকয়েক শব্দকে নিয়েই সেগুলি শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে সেগুলি জটিল আকার ধারণ করে। কিন্তু সংস্কৃত ভাষাটি আবিষ্কৃত হয়েছিল কারণ, আজ আমরা জানি যে, অসিলোস্কোপ (oscilloscope) যন্ত্রের মধ্যে যদি ধ্বনিকে প্রবেশ করাও, প্রতিটি ধ্বনির সঙ্গে একটি নিজস্ব অবয়ব তৈরি হয়। ঠিক তেমনই, প্রতিটি অবয়বের সঙ্গেও একটি নিজস্ব ধ্বনি জড়িয়ে থাকে। সৃষ্টির বুকে প্রতিটি অবয়বই অনুরণিত হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট প্রকরণে এবং উৎপন্ন করে চলেছে একটি নির্দিষ্ট ধ্বনি।

যখনই তুমি কোনও ধ্বনি উচ্চারণ করো, তার সঙ্গে একটি অবয়বও তৈরি হয়। নির্দিষ্ট ধ্বনিকে ব্যবহার করে সঠিক প্রকরণের অবয়ব সৃষ্টির এই পদ্ধতি একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানের অন্তর্গত। সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে সজ্জিত ভিন্ন ভিন্ন ধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে আমরা শক্তিশালী অবয়ব সৃষ্টি করতে পারি। এটিই নাদযোগ হিসেবে পরিচিত, ধ্বনির ব্যবহার বিশিষ্ট যোগবিদ্যা। ধ্বনি উৎসারণে তুমি নৈপুণ্য অর্জন করলে, তার সংশ্লিষ্ট বাহ্য প্রতিরূপ বা অবয়ব সৃষ্টির উপরেও তোমার দক্ষতা অর্জিত হবে।

সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে সজ্জিত ভিন্ন ভিন্ন ধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে আমরা শক্তিশালী অবয়ব সৃষ্টি করতে পারি। এটিই নাদযোগ হিসেবে পরিচিত, ধ্বনির ব্যবহার বিশিষ্ট যোগবিদ্যা।

শৈশবে আমার ক্ষেত্রে এটা ঘটত : কোন ব্যক্তি যদি কথা বলতেন, আমি তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতাম। প্রাথমিক ভাবে আমি তাদের শব্দগুলি শুনতাম। তারপর শুধু ধ্বনি। কিছুটা সময় পর আমি শুধু তাদের চারপাশে কিছু বিষ্ময়কর নকশার আঁকিবুঁকি ঘটতে দেখতাম যা আমাকে এতটাই বিভোর করে রাখতো, বিষ্ময়ে অভিভূত ও আমোদিত করতো যে, একটি শব্দও না বুঝে আমি সারাজীবন তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতাম, কারণ, সেই শব্দগুলি আমি একেবারেই শুনতাম না।

সংস্কৃত হল একমাত্র ভাষা যেখানে একটি ধ্বনি ও তার সংশ্লিষ্ট প্রতিরূপটি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণ হিসেবে, ইংরাজি ভাষায় “sun” বা “son” যাই বলা হোক না কেন, উচ্চারণের ক্ষেত্রে উভয়ই সমান, শুধুমাত্র বানানের ক্ষেত্রে তারতম্য রয়েছে। তুমি কী লিখছো সেটা বিবেচ্য নয়। ধ্বনিটিই এখানে বিবেচ্য। তুমি যখন অনুভব করো যে, কোনও একটি নির্দিষ্ট প্রতিরূপ বা বাহ্য অবয়বের সঙ্গে ঠিক কোন ধ্বনিটি সংশ্লিষ্ট, সেই অবয়বটির জন্য তুমি সেই ধ্বনিটির নামকরণ করো। এখন একটি ধ্বনি ও তার সংশ্লিষ্ট অবয়বটি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি তুমি ধ্বনিটি উচ্চারণ করো, অবয়বটির সঙ্গেও তুমি সম্পর্ক স্থাপন করছো – শুধু মানসিক ভাবে নয়, সামগ্রিক সৃষ্টির প্রেক্ষিতে অবয়বটির সঙ্গে তুমি সম্পর্ক তৈরি করছো। সংস্কৃত ভাষাটি যেন সমগ্র সৃষ্টির নীলনকশার মতো। অবয়বটির মধ্যে যা রয়েছে, আমরা তাকে ধ্বনিতে রূপান্তরিত করেছি। প্রভূত বিচ্যূতি ঘটে গেছে হয়ে গেছে। কীভাবে এটিকে সঠিক রূপে সংরক্ষণ করা যায় তা আজ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ, প্রয়োজনীয় জ্ঞান, বোধগম্যতা এবং সচেতনতার সামগ্রিক অভাব হচ্ছে আজ।

শব্দের চেয়ে ধ্বনিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ

এই কারণেই সংস্কৃত ভাষাটি যখন শেখানো হয়, কন্ঠস্থ করার মাধ্যমে এটি শিখতে হয়। মানুষ ভাষাটিকে শুধু উচ্চারণ করে চলেন বিরামহীনভাবে। উচ্চারিত শব্দের অর্থটি তুমি জানো কি না তাতে কিছু যায় আসে না। এক্ষেত্রে ধ্বনিটিই গুরুত্বপূর্ণ, শব্দের অর্থ নয়। শব্দের অর্থ তৈরি হয় তোমার মনের মধ্যে। এখানে সংশ্লিষ্ট ধ্বনি ও তার অবয়বটি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে। তুমি সংযুক্ত হতে পারছো কি না, সেটিই হল প্রশ্ন। সেই কারণেই সংস্কৃত ভাষাটি তামিল ভাষা ছাড়া প্রায় সব ভারতীয় ও ইউরোপীয় ভাষার জননী হয়ে উঠেছে। তামিল ভাষাটি সংস্কৃত থেকে আসেনি। এটি স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠেছে। অন্যান্য সমস্ত ভারতীয় ভাষা ও প্রায় অধিকাংশ ইউরোপীয় ভাষার উৎসটি রয়েছে সংস্কৃত ভাষার মধ্যে।

মন্ত্রের মাধ্যমে কীভাবে উপকৃত হওয়া যায়

সঙ্গীত হল মাধুর্য উৎপাদনে সক্ষম অগণিত ধ্বনির সুবিন্যাস। সঙ্গীত সুবিন্যস্ত ঠিকই, কিন্তু তবুও এটি জলপ্রবাহের মতো। মন্ত্রের ধ্বনিতে ততখানি নান্দনিক সৌকর্য নেই ঠিকই, কিন্তু এটি অনেক বেশি কার্যকরী। আমি চাই তোমরা এটা চেষ্টা করে দেখো – সাউন্ডস অফ্‌ ঈশা বৈরাগ্য নামের একটি সিডি প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে পাঁচটি মন্ত্র: Nirvana Shatakam, Guru Paduka Stotram, Brahmananda Swarupa, Aum Namah Shivaya, and Shambho (“the auspicious one”). একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই এটি প্রকাশিত হয়েছে। দশ মিনিট ব্যাপী দীর্ঘ এই পাঁচটি মন্ত্রের প্রত্যেকটি বারংবার মনোযোগী হয়ে শোনো। খেয়াল করে দেখো, কোন নির্দিষ্ট মন্ত্রটি তোমাকে প্রকৃতই আকর্ষিত করছে। এটা কোনও একটা মন্ত্রকে বেছে নেওয়া নয় যে, “ওহঃ এই মন্ত্রটি আমার ভাল লাগছে, তুমি কোনটা পছন্দ করেছো, ঠিক আছে, আমিও ওটা পছন্দ করছি”। ব্যাপারটা এভাবে হয় না। শুধু শোনো এবং শুনতে থাকো। যখন তুমি অনুভব করবে যে, ওদের মধ্যে কোনও একটি সত্যিই তোমাকে আবিষ্ট করছে, সেটিকেই শুনতে থাকো। সব সময় এটিকে চালিয়ে রাখো – তোমার গাড়িতে, তোমার বাড়িতে, অ্যাই প্যাড, অ্যাই পড, ফোন, সর্বত্র। এক ঘন্টার মেয়াদেও এগুলির প্রত্যেকটিকে পাওয়া যায়। সাবলীল্ভাবে সেগুলিকে শুনতে থাকো বেশ কিছুদিন ধরে।

কিছুদিনের মধ্যেই এটি তোমার দেহতন্ত্রের অন্যতম অংশ হয়ে উঠবে এবং তোমার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিবেষ্টনী তৈরি করে দেবে। মন্ত্র চৈতন্য নয়, কিন্তু সঠিক পরিবেষ্টনী তৈরি করে দেয় মন্ত্র। ধ্বনিই তৈরি করে দেবে সঠিক পরিবেষ্টনী, এই শরীর ও মনের পরিসীমা এবং আবহমন্ডলে। যে কেউ এটিকে কাজে লাগাতে পারে।

বৈরাগ্য মন্ত্র

https://www.youtube.com/playlist?list=PLd1t7W2ShsB8dpyiUWpQeP0hQag12fwnX

অ্যালবামটি mp3 downloads এবং হিসেবে পাওয়া যাবে।.

নাদ ব্রহ্মঃ জগতের ধ্বনিময় অনুভব

 

“নাদ” শব্দটির অর্থ “ধ্বনি”, “ব্রহ্ম” শব্দটির অর্থ “দৈব শক্তি”, যা সমগ্রের প্রতীক। এই সৃষ্টির মাঝে বিরজিত তিনটি মাত্র মৌলিক ধ্বনি। অপর যে কোনও ধ্বনিই ওই তিনটি মৌলিক ধ্বনি থেকেই উৎপন্ন হয়। যদি তুমি রঙিন টেলিভিসন সম্পর্কে কিছু জানো, দেখবে সেখানে রয়েছে তিনটি মাত্র বর্ণ তরঙ্গ। ওই তিনটি বর্ণ তরঙ্গ থেকেই যে কোনও সংখ্যক বর্ণ তরঙ্গের সৃষ্টি হতে পারে। একইভাবে, ওই তিনটি ধ্বনি থেকেই যে কোনও সংখ্যক ধ্বনি সৃষ্টি হতে পারে। একটি সহজ পরীক্ষার সাহায্যে তুমি এটা দেখতে পারো - জিভের ব্যবহার না করে তুমি মাত্র তিনটি ধ্বনিই উৎপন্ন করতে পারবে- “আআআ” (“AAA”), “উউউ” (“OUUU”) এবং “মমম” (“MMM”)। এমনকি যদি তোমার জিহ্বাটি কেটেও ফেলো, তার পরেও তুমি এই তিনটি ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারবে। অন্য যে কোনও ধ্বনির জন্য তোমার জিহ্বাটি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। তোমার জিহ্বাটি ব্যবহার করছো শুধুমাত্র এই তিনটি ধ্বনিকে নানা রকম ভাবে মিশিয়ে অন্য সব রকমের ধ্বনি উৎপন্ন করার জন্য। তোমার মুখগহ্বরের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ধ্বনি তুমি উৎপন্ন করতে পারো, কিন্তু একজন মূক মানুষ শুধুমাত্র “আআআ”, “উউউ”, “মমম” উচ্চারণ করতে পারেন। অন্য কোনও কিছুই তিনি বলতে পারেন না কারণ, তিনি জিহ্বাটি ব্যবহার করতে পারেন না।

আউম – সৃষ্টির মৌলিক ধ্বনি

এই তিনটি ধ্বনি একত্রে উচ্চারণ করলে কী পাবে তুমি ? “আউম”। “আউম” ধ্বনিটি কোনও প্রথাগত ধর্মের ট্রেডমার্ক নয়। এটি সৃষ্টির মৌলিক ধ্বনি বা নাদ। কথিত আছে, “আউম” ধ্বনিটি মাত্র তিনবার উচ্চারণের মাধ্যমেই সমগ্র সৃষ্টিকে তৈরি করতে পারতেন মহাশিব। এটি প্রকৃত ঘটনা (fact) নয়, কিন্তু সত্য (truth)। একটি ঘটনা ও সত্যের মধ্যে পার্থক্যটি কী ? ধরা যাক, তুমি একজন নারী। তার অর্থ কী এটা যে, তোমার পিতার কোনও অবদান নেই তোমার মধ্যে ? তার অর্থ কী এটা যে, তোমার পিতার কোনও অস্তিত্ব নেই তোমার মধ্যে ? না। তাই ঘটনাচক্রে তুমি একজন পুরুষ অথবা নারী। কিন্তু সত্য হল, নারী ও পুরুষ, উভয় সত্তাই তোমার মধ্যে বিদ্যমান। পৌরাণিক কথনের অর্থ এই নয় যে, কোথাও একটা বসে “আউম” উচ্চারণ করেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি করলেন শিব। বিষয়টা তা নয়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হল, সমগ্র মহাবিশ্বই স্পন্দন ছাড়া কিছু নয়।

“আউম” ধ্বনিটি কোনও প্রথাগত ধর্মের ট্রেডমার্ক নয়। এটি সৃষ্টির মৌলিক ধ্বনি বা নাদ।

একে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। বেশ কিছু বছর আগে, আমি একমাস বা দু’মাস ধরে হিমালয় ভ্রমণে যেতাম এবং প্রতিবার আমি কেদারনাথে যেতাম। কেদার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অসাধারণ জায়গা। কেদারের উপর দিকে কান্তি সরোবর নামে একটি জায়গা আছে, সাধারণভাবে মানুষ সেখানে যায় না এর দুর্গম যাত্রাপথের জন্য। আমি ট্রেকিং করে কান্তি সরোবরে পৌঁছাই এবং একটি পাথরের উপর বিশ্রামের বিশ্রামের জন্য বসি।

এটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন, কিন্তু কিছুটা সময় বসে থাকার পর আমার প্রত্যক্ষ অনুভবে সবকিছুই যেন ধ্বনিতে রূপান্তরিত হল। আমার শরীর, পাহাড়, সামনের হ্রদটি – সব কিছুই যেন ধ্বনিতে পরিণত হল। এটা যেন ধ্বনিময় আকারে পরিণত হয়েছিল এবং আমার মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সেটা অনুরণিত হচ্ছিল। আমার মুখ বন্ধ ছিল – আমার স্পষ্ট মনে আছে সেটা – কিন্তু আমার গলার স্বর উচ্চনাদে চারপাশে প্রতিধ্বনিত্ব হচ্ছিল, যেন মাইক্রোফোনের মধ্যে দিয়ে এটা গান গাইছিল এবং সেটাও আবার সংস্কৃত ভাষায়

নাদ ব্রহ্ম বিশ্বস্বরূপ
নাদ হি সকল জীবরূপ
নাদ হি কর্ম নাদ হি ধর্ম
নাদ হি বন্ধন নাদ হি মুক্তি
নাদ হি শঙ্কর নাদ হি শক্তি
নাদম নাদম সর্বম নাদম
নাদম নাদম নাদম নাদম

অর্থ: নাদ (ধ্বনি)-ই ব্রহ্ম, যা মহাবিশ্বরূপে প্রকাশিত; নাদ (ধ্বনি)-ই সকল জীবরূপে প্রকাশিত; নাদ (ধ্বনি)-ই কর্ম, নাদ (ধ্বনি)-ই ধর্ম; নাদ (ধ্বনি)-ই বন্ধন, (ধ্বনি)-ই মুক্তি; নাদ (ধ্বনি)-তেই সবকিছু অর্পিত, নাদ (ধ্বনি)-ই সব কিছুর চালিকাশক্তি, নাদ (ধ্বনি)-ই হল সর্বরূপ।

যদি ওই গানটির কাছে তুমি নিজেকে উৎসর্গ করো, এর মধ্যে এক অন্যন্য শক্তি রয়েছে। যদি তুমি নিজেকে এর মধ্যে নিমগ্ন করতে পারো, কোনও ব্যক্তিকে দ্রবীভূত করার ক্ষমতা রয়েছে এর মধ্যে।

“আউম” উচ্চারণের উপকার

সদগুরুর কথায় অণুপ্রাণিত হয়ে নয়াদিল্লীর লেডি আরউইন কলেজের দুই গবেষক দৌড়বিদদের শরীরে “আউম” মন্ত্র উচ্চারণের উপকারীতা নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা করেন কয়েক বছর আগে। পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় যে, ঈশা’র আউম’কার মেডিটেশন অভ্যাসের ফলস্বরূপ দৌড়বিদদের মধ্যে দৈহিক আর্দ্রতার মাত্রা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ সালে ডঃ প্রীতিঋষি লালের এই দু’মাস ব্যাপী পর্যবেক্ষণটি ক্লিনিক্যাল ও স্পোর্টস নিউট্রিশন বিষয়ক গবেষণার অংশ হিসেবে সেই বছরের অক্টোবর মাসে উপস্থাপিত হয় আমেরিকার ইলিনয়েসে আয়োজিত ফুড স্টাডিস বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে। পর্যবেক্ষণটি শ্রীমতি অঞ্চল অগ্রবালের স্নাতকোত্তর গবেষণা পত্রেও প্রকাশিত হয় Master’s thesis,, যেটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল – “কাম অ্যান্ড প্লে” কর্মসূচীর অঙ্গ হিসেবে সাই (SAI বা Sports Authority of India)- এর ক্যাম্পাসে প্রশিক্ষণরত তরুণ পুরুষ হকি খেলোয়াড়দের জলপানের অভ্যাস উন্নত করা।

শ্রীমতি অগ্রবাল ও ডঃ লাল দেখেছিলেন যে, খেলার সময় যঠেষ্ট জলপানের প্রয়োজনীয়তার কথা শেখানো সত্ত্বেও, অধিকাংশ খেলোয়াড়ই খেলা চলাকালীন জলের ঘাটতিতে ভুগছিলেন, যা তাদের দক্ষতা ও শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছিল, পাশাপাশি তাদের দীর্ঘ মেয়াদী শারীরিক সমস্যাও ডেকে আনছিল।

ডঃ লালের কথায়, “শরীরে জলের প্রয়োজন সম্পর্কে ইতিমধ্যেই খেলোয়াড়দের শেখানো হয়েছিল। তাদের তথ্য দেওয়া হয়েছিল আর পাশাপাশি হাতে কলমে প্রমাণও দেখানো হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, যখন শরীরে জলের মাত্রা সম্পর্কে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল তাদের অধিকাংশই ১০০ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল। তাদের করণীয় কী সেটা তারা জানত, কিন্তু কিছুতেই তারা সেটা করছিল না। তাদের তথ্যজ্ঞান এবং প্রকৃত আচরণগত পরিবর্তনের মধ্যে একটি সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। শরীরে তৃষ্ণার মাত্রা সম্পর্কে সচেতন বোধের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল”। আউম’কার কি তার উত্তর ছিল ?

তথ্যজ্ঞান ও আচরণের সামঞ্জস্য বিধান

গবেষণার ফলে ইতিমধ্যেই আউম মেডিটেশনের শারীরিক ও মানসিক সুফলগুলি জানা হয়ে গেছে। শ্রীমতী অগ্রবাল ও ডঃ লাল অন্যান্য জায়গায় যা শেখানো হয় তার সঙ্গে ঈশা প্রদত্ত আউম’কার মেডিটেশনের একটি নির্দিষ্ট পার্থক্য নিরুপণ করেছিলেন। শ্রীমতী অগ্রবাল বলেন, “সাম্প্রতিক ভারতীয় পর্যবেক্ষণে আউম’কে একমাত্রিক ওম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে..... ঈশা ফাউন্ডেশন এটিকে ত্রিমাত্রিক হিসেবে প্রদান করে”। শম্ভাবী মহামুদ্রার ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে গবেষণার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, “আউম সম্বলিত যৌগিক অনুশীলনের ফলে মস্তিষ্কের ক্রীয়াশীলতা উন্নত হওয়ার কথা সম্প্রতি জানা গেছে”। এটিই ছিল অন্যতম কারণ, যার জন্য গবেষকরা শরীরে জলীয় মাত্রার গবেষণায় “তথ্যজ্ঞান ও আচরণের সামঞ্জস্য বিধান”-এর মাধ্যম হিসেবে আউম’কার মেডিটেশনকে বেছে নিয়াছিলেন।

এর প্রভাবে হৃৎস্পন্দনের গতি ও শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষায় তাদের ফলও ভাল পাওয়া যায়। খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রফুল্লতার অনুভূতি, শান্তি ও বেশি একাগ্রতাও লক্ষ্য করা যায়।

পর্যবেক্ষণ পর্বে গবেষকরা ৩০ জন খেলোয়াড়কে তাৎক্ষণিক ভাবে দু’টি দলে ভাগ করে দেন - একটি দল ছিল নিয়ন্ত্রক দল বা Control Group - এই দলের খেলোয়াড়দের প্রয়োজনীয় জলপানের সম্পর্কে শুধুমাত্র তথ্যগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, - এবং অপরদিকে ছিল পরীক্ষা মূলক দল বা Experimental Group, - দলটির সদস্যদের তথ্য প্রশিক্ষণ ছাড়াও ২১ দিন ধরে প্রতিদিন ২১ মিনিট করে আউম’কার মেডিটেশন অভ্যাস করানো হয়। ২১ দিন পর পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, খেলার পর মেডিটেশন অভ্যাসকারী খেলোয়াড়দের দৈহিক আর্দ্রতার স্তর নিয়ন্ত্রক দলের সদস্যদের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেশি স্বাস্থ্যকর মাত্রার কাছাকাছি। এর প্রভাবে হৃৎস্পন্দনের গতি ও শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষায় তাদের ফলও ভাল পাওয়া যায়। খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রফুল্লতার অনুভূতি, শান্তি ও বেশি একাগ্রতাও লক্ষ্য করা যায়।

“অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই আমার কাছে এসে খেলার মানের পাশাপাশি অন্যান্য সুফল পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও বলেন। একজন অংশগ্রহণকারী আমাকে বলেন যে, তিনি বাড়িতে প্রত্যেকের সঙ্গে আরও সুন্দরভাবে মিশতে পারছেন। পরীক্ষা পর্বে তারা অনেক বেশি পরিণত হয়েছেন বলে মনে হয়েছে। পরীক্ষা পর্বটি সম্ভাবনার পরিপূর্ণ দিগন্ত উন্মোচিত করে দিয়েছে। ঈশা প্রদত্ত মেডিটেশনের আরও উপকারিতা খুঁজে বার করার জন্য আমরা আরও দুটি পরীক্ষার পরিকল্পনা করেছি ইতিমধ্যেই”, বলেন ডঃ লাল।

Editor’s Note: সম্পাদকের কথা :- ঈশা হঠযোগ স্কুলের ২১ সপ্তাহ ব্যাপী হঠযোগ শিক্ষক শিক্ষণ কর্মসূচীতে প্রদত্ত সদগুরুর বক্তব্য থেকে কথাগুলি নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচীটি যৌগিক বিদ্যাকে বোঝা ও হঠযোগ শিক্ষক হিসেবে দক্ষতা অর্জনের অতুলনীয় সম্ভাবনা প্রদান করে। পরবর্তী পর্বটি অনুষ্ঠিত হবে ২০১৯ সালের ১৬ই জুলাই থেকে ১১ই ডিসেম্বর পর্যন্ত। আরও তথ্য পেতে দেখে নিন www.ishahathayoga.com  অথবা ইমেল করুন  info@ishahatayoga.com

 
 
 
 
  0 Comments
 
 
Login / to join the conversation1