মহাত্মার স্মরণে

সদগুরু মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ দিয়ে আমাদের জীবনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধতার গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন।
 

সদগুরু মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ দিয়ে আমাদের জীবনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধতার গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন।

সদগুরু: শুধুমাত্র অঙ্গীকারবদ্ধতা থেকে জগতে অসামান্য সব কাজ করা হয়েছে। এর এক অসাধারণ উদাহরণ মহাত্মা গান্ধী। যদি আপনি এই মানুষটিকে দেখেন, তিনি প্রতিভাশালী বা বিশেষ কিছু ছিলেন না, দয়া করে দেখুন। ছোটবেলায় তিনি বিরাট কোন সম্ভাবনা দেখান নি। তিনি অসাধারণ বুদ্ধিমান ছিলেন না। তিনি কোন শিল্পী, বৈজ্ঞানিক বা এমনকি একজন খুব ভালো উকিলও ছিলেন না। ভারতে তিনি সাফল্যের সাথে ব্যারিস্টারিও করতে পারেন নি, যে কারণে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন ভাল সুযোগের আশায়। এমনকি সেখানেও তিনি খুব একটা সফল ছিলেন না। কিন্তু হঠাৎই মানুষটি কোন একটি ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন৷ এতটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন যে তিনি এক বিরাট ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠলেন।

আমার মনে আছে, তিনি ভারতের একটি আদালতে তাঁর প্রথম কেসের ব্যাপারে কি লিখেছিলেন - তিনি তার কেসটি লড়তে উঠে দাঁড়ালেন এবং খুবই হতাশ হয়ে পড়লেন। এটা কি মহাত্মা গান্ধীর মত শোনাচ্ছে? এই মানুষটি লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্দীপিত করেছেন। জীবনের মাত্র একটি ঘটনা- আচমকা তার আত্মপরিচয়ের সমস্ত সীমানা ভেঙে যায়।

তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন জীবিকার উদ্দেশ্যে এবং উকিল হিসেবে মোটামুটি কাজ করছিলেন। একদিন তিনি প্রথম শ্রেণীর একটি টিকিট কেটে ট্রেনে উঠলেন এবং কিছু দূর ভ্রমণ করলেন৷ পরের স্টেশনে এক শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান ট্রেনে উঠলেন৷ এই লোকটি একজন বাদামী চামড়ার মানুষকে প্রথম শ্রেণীতে বসে থাকতে দেখে সেটা পছন্দ করলেন না, তো তিনি টিকিট কালেক্টরকে ডাকলেন। টিকিট কালেক্টর বললেন "বেরিয়ে যাও"। মহাত্মা গান্ধী বললেন, "আমার কাছে প্রথম শ্রেণীর টিকিট আছে"।

"তাতে কিছু যায় আসে না, তুমি বেরিয়ে যাও।"

"না, আমার কাছে প্রথম শ্রেণীর টিকিট আছে৷ আমি কেন বেরিয়ে যাব?"

ওরা গান্ধীজীকে ব্যাগপত্রসহ ট্রেন থেকে ফেলে দিল এবং তিনি প্লাটফর্মে পড়ে গেলেন। তিনি সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেন। তিনি ভাবলেন, "এটা কেন হল আমার সাথে? আমি তো প্রথম শ্রেণীর টিকিট কেটেছিলাম। কেন আমাকে ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল?" সেই মূহূর্ত থেকে তিনি নিজেকে মানুষের বৃহত্তর দূর্দশার সাথে এক করে দেখলেন। এর আগে পর্যন্ত জীবনে টিকে থাকা, ওকালতি করা এবং অর্থ উপার্জন - এসবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর কাছে। কিন্তু এবার তিনি অনেক বৃহত্তর একটি সমস্যার সাথে নিজেকে একাত্ম করলেন। তিনি তার আত্মপরিচয়ের ছোট্ট গন্ডি ভেঙে ফেলে একটি অনেক বৃহত্তর ব্যক্তিসত্তায় উন্নীত হলেন৷

যদি আমরা আমাদের জীবনে যে কাজ বেছে নিয়েছি, তার প্রতি প্রকৃতই অঙ্গীকারবদ্ধ হই, তার ফলাফল প্রভূত।

অনেক মানুষ, ইতিহাসে যাদের আমরা বিরাট ব্যক্তিত্ব হিসেবে জানি- তাদের সাথে এটাই ঘটেছিল। তারা একটি সীমিত আত্মপরিচয় নিয়ে জীবন কাটাচ্ছিলেন৷ হঠাৎই কোন একটি ঘটনা ঘটে যা তাদের ব্যক্তিসত্তার গন্ডীকে ভেঙে দেয় এবং তখন তারা তাদের চারপাশে ঘটে চলা এক বৃহত্তর প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে যান। তারা এমনসব জিনিস করেন যা করা সম্ভব বলে তারা নিজেরাই কল্পনা করেন নি।

গান্ধীজি সেইভাবেই লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্দীপিত করেছিলেন। শুধু ভারতবর্ষে নয়, পৃথিবীর যেকোন জায়গায় আপনি মহাত্মার নাম নিলে- সকলেই শ্রদ্ধা জানান। এসমস্ত এমন একটা সময় ঘটেছিল যখন ভারতে অনেক নেতা ছিলেন- যাঁরা প্রকৃতই বিরাট ব্যক্তিত্ত্ব। তারা বেশি প্রতিভাশালী ছিলেন, অনেক ভালো বক্তা এবং অনেক বেশি শিক্ষিত ছিলেন। তবুও এই মানুষটি তাদের সবার উপরে ওঠেন, শুধুমাত্র তাঁর অঙ্গীকারবদ্ধতার জন্য।

যাই ঘটুক না কেন - জীবন বা মৃত্যু, অঙ্গীকার যেন কখনই পরিবর্তিত না হয়। সত্যিকারের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে আপনি সম্ভাব্য সবরকম উপায়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করুন। যখন অঙ্গীকারবদ্ধতায় খামতি থাকে- কোথাও আপনি নিজের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেন। যখন আমাদের এখানে থাকার উদ্দেশ্যটাই হারিয়ে যায়, লক্ষ্য পূরণের আর কোন প্রশ্নই থাকে না, তাই নয় কি?

কাজেই অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া- আমাদের নিজেদের ভেতরেই স্থির করতে হবে। আমাদের জীবনে আমরা যে কাজই করি না কেন, তার প্রতি যদি আমরা প্রকৃতই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই- ফলাফল প্রভূত; জানেন তো? যদি ফল না আসে - একজন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষের কাছে পরাজয় বলে কিছুই নেই। আমি যদি দিনে একশো বার পড়ে যাই কি করব? উঠে দাঁড়িয়ে আবার চলতে শুরু করব, ব্যাস।

অঙ্গীকারবদ্ধতা মানে উগ্রতা নয়, সেটা বুঝতে হবে। এখানেই মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ ভীষণভাবে প্রযোজ্য। তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন - কিন্তু একই সাথে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ছিলেন না। সেটাই ছিল সেরা দিক, তাই নয় কি? এতেই মানুষটির পরিণতমনস্কতা বোঝা যায়।

Editor’s Note: Download “Culture of Peace,” first published in print in 2008, is now available as an ebook on a “name your price” basis. In this 22-page booklet, you can read about Sadhguru’s insights into the basis of conflict, misconceptions about peace and how each of us can help to create a generation of peaceful human beings.