কীভাবে আদি শংকরাচার্য এক মৃত রাজার দেহে প্রবেশ করেছিলেন ?

দেহান্তর কি সম্ভব? এখানে সদগুরু একটি ঘটনার কথা বলছেন, যেখানে আদি শংকরাচার্য একবার তর্কে জেতার জন্য অন্য একজনের শরীরে প্রবেশ করেছিলেন।
কীভাবে আদি শংকরাচার্য এক মৃত রাজার দেহে প্রবেশ করেছিলেন ?
 

প্র: কথিত আছে যে আদি শংকরাচার্য এক রাজার দেহে প্রবেশ করে বেশ কিছুদিনের জন্য তাতে অবস্থান করেছিলেন। বাস্তবে এটা কি সম্ভব ? যদি তাই হয়, কীভাবে? যোগ বিজ্ঞানে কী ধরনের দক্ষতা এরকম কৃতিত্বকে সম্ভবপর করে তুলতে পারে?  

সদগুরু: আদি শংকরাচার্য একজনের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং তাতে জিতেও ছিলেন। তারপরে সেই ব্যক্তির স্ত্রী সুচতুরভাবে নিজেকে তর্কের মধ্যে নিয়ে এলেন - চেনেন তো স্ত্রী জাতিকে! আদি শংকরাচার্য একজন চূড়ান্ত স্তরের যুক্তিবিদ- এরকম একজন মানুষের সঙ্গে আপনার তর্ক করা উচিত নয়। কিন্তু মহিলাটি নিজেকে তর্কের মধ্যে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন। বললেন "আপনি আমার স্বামীকে পরাজিত করেছেন, কিন্তু উনি একা সম্পূর্ণ নন । আমরা একই জিনিসের দুটি অর্ধাংশ। তাই আপনাকে অবশ্যই আমার সঙ্গেও তর্ক করতে হবে।" এই যুক্তি আপনি কীভাবে খন্ডন করতে পারেন? সুতরাং মহিলাটির সঙ্গে তর্ক শুরু হলো। তারপর যখন মহিলাটি দেখলেন যে তিনি হারতে চলেছেন তখন তাঁকে (শঙ্করাচার্যকে) মানুষের যৌনতা বিষয়ক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলেন। শংকরাচার্য যা বলবার বললেন। তারপর মহিলাটি আরও বিস্তারিত বিবরণের মধ্যে গেলেন, জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি আপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে কী জানেন?" তো, শঙ্করাচার্য ছিলেন ব্রহ্মচারী। উনি জানতেন যে এটা তাকে পরাজিত করার জন্য একটি কৌশল । তাই তিনি বললেন, "আমার এক মাসের বিরতি প্রয়োজন। আমরা যেখানে থামলাম একমাস পরে আবার সেখান থেকে শুরু করব।"

তারপর তিনি একটা গুহার মধ্যে গিয়ে তার শিষ্যদের বললেন, "যাই ঘটুক না কেন, কাউকে এই গুহার মধ্যে ঢুকতে দিও না কারণ কিছুদিনের জন্য আমি আমার শরীর ত্যাগ করে অন্য সম্ভাবনার খোঁজে যাচ্ছি।"

প্রাণশক্তি বা প্রাণ পাঁচটি মাত্রায় প্রকাশিত হয়: প্রাণবায়ু, সমান, অপান, উদান এবং ব্যান। প্রাণের এই পাঁচটি অভিব্যক্তির কাজও আলাদা। প্রাণবায়ু শ্বাসকার্য, চিন্তাভাবনা এবং স্পর্শানুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কেউ জীবিত না মৃত আপনি তা কীভাবে পরীক্ষা করবেন? যদি তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় আপনি তাকে মৃত বলবেন। শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে কারণ তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যেতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রাণবায়ু সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে যেতে দেড় ঘন্টা পর্যন্ত সময় নেয়।

এই কারণে এটা প্রথাগত রীতি ছিল যে, শ্বাস থেমে যাওয়ার পরে, কাউকে দাহ করতে হলে কমপক্ষে দেড় ঘণ্টা সময় অপেক্ষা করতে হবে- কারণ অন্য অনেক ভাবে তিনি তখনও জীবিত। আমরা দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করি যাতে তাঁর চিন্তা প্রক্রিয়া, শ্বাস কার্য এবং তাঁর অনুভূতি চলে যায়, যাতে তিনি দগ্ধ হওয়াটা অনুভব করতে না পারেন। এবারে প্রাণের বাকি অংশ কিন্তু তখনও সেখানে থেকে যায়। ব্যান প্রাণের শেষ স্তরটি, বারো থেকে চৌদ্দ দিন পর্যন্ত থেকে যেতে পারে। দেহের সংরক্ষণ এবং সমন্বয় অনেকাংশেই ব্যান প্রাণের ক্রিয়ার কারণে ঘটে। তাই যখন শঙ্করাচার্য তাঁর দেহ ত্যাগ করলেন, তিনি ব্যানকে তাঁর দেহতন্ত্রেই ছেড়ে গেলেন কারণ তার দেহটিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন ছিল।

ঘটনাটা এরকম ছিল, এক রাজা কেউটের দংশনে মারা গিয়েছিলেন। যখন কেউটের বিষ আপনার দেহে প্রবেশ করে, আপনার রক্ত তখন জমাট বাঁধতে শুরু করে, শ্বাস কার্য কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ যখন রক্ত সঞ্চালন অসুবিধাজনক হয় তখন শ্বাস নেওয়াটা কষ্টকর হয়ে যায়। আপনার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার অনেক আগেই আপনার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। যিনি সেই দেহে প্রবেশ করতে চান তার পক্ষে অনেক দিক থেকেই এটা একটা আদর্শ পরিস্থিতি। এমনিতে এটা আপনাকে মাত্র দেড়ঘন্টা সময় দেবে, সুযোগের সদ্ব্যবহারের জন্য। কিন্তু যখন একজনের শরীরে কেউটের বিষ প্রবেশ করেছে তখন এটা আপনাকে সাড়ে চার ঘন্টা পর্যন্ত সময় দেবে।  

সুতরাং শংকরাচার্য এই সুযোগটা পেলেন আর খুব সহজেই রাজার দেহে প্রবেশ করলেন। তিনি সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেলেন যাতে তিনি অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে সে প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারেন। সেখানে রাজার পারিষদমন্ডলীর মধ্যে কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। যখন তাঁরা দেখলেন, যে মানুষটিকে তাঁরা মৃত বলে ঘোষণা করেছেন, সে হঠাৎ পূর্ণশক্তিতে উঠে বসেছে তখন তাঁর ব্যবহার দেখে ওনারা বুঝতে পারলেন যে ইনি সেই একই মানুষ নন বরং একই দেহে অন্য কোনও মানুষ। তাই তাঁরা শহরের সব জায়গায় সৈন্য পাঠালেন, তাদেরকে বলে দিলেন যে যদি তারা কোথাও কোনো মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে তখনই যেন তা পুড়িয়ে ফেলে- যাতে যে ব্যক্তি রাজার দেহের মধ্যে এসেছে, সেটা যদি তার দেহ হয়, সে এই দেহ ফেলে আর ওই দেহে ফিরে যেতে পারবে না। কারণ রাজা এখন বেঁচে উঠেছেন, যদিও একজন অন্য মানুষ, কিন্তু তাতে কী হয়েছে? তিনি দেখতে তো একই রকম।

তো এরকম ব্যাপার কি সম্ভব? হ্যাঁ, এটা খুবই সম্ভব। এটা কি একটা কৃতিত্ব? বাস্তবিক এটা সেরকম কিছু কৃতিত্ব নয়। আপনার ভিতরে জীবন কীভাবে স্পন্দিত হচ্ছে তার কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে একটু ধারনা হলেই যথেষ্ট – এর বেশি প্রয়োজন নেই। এবার কেউ যদি কোনও জীবন্ত দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে চায়, সেটা অনেক কঠিন ব্যাপার হবে। যে সদ্য দেহত্যাগ করেছে তার মধ্যে প্রবেশ করাটা অনেক সহজ। প্রথম দেড় ঘণ্টা শরীরে প্রবেশের আদর্শ সময়, কারণ এই সময় প্রয়োজনীয় শূন্যস্থান তৈরি হয়, আবার একই সময়ে সবকিছুই চলতে থাকে। এজন্য ভারতবর্ষে যখন কারোর শ্বাস ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসতে থাকে তখন তাকে সব সময় বাড়ির ঠিক বাইরে এনে রাখা হয়। তারা সম্বরানি (এক ধরনের সুগন্ধি) ধূপ দেয় আর কিছু মন্ত্রোচ্চারণ করতে শুরু করে। এটা যে বিদায় নিচ্ছে তাকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য, আর অন্য কেউ যাতে তার দেহ জবরদখল না করতে পারে সেটাও নিশ্চিত করার জন্য। 

তাই অনেক রকম পদ্ধতি আর সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল যাতে এরকম কোনও ব্যাপার না ঘটে। কিন্তু আজকাল এটা এত বিরল ঘটনা যে, এখন মানুষ একে একটা কৃতিত্ব হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেছে।

 

 
 
  0 Comments
 
 
Login / to join the conversation1