কঙ্গনা রানাওত: সদগুরু, আপনি বলেন যে, কর্মের বন্ধন কাটানোর জন্য আমাদের সর্বদা সচেষ্ট হওয়া উচিত, কিন্তু আপনি এও বলেন যে, সব কিছুকে নিজের মধ্যে অন্তর্নিবেশ ঘটানো বা সব কিছুর সঙ্গে আবিষ্ট হয়ে থাকা উচিত। দু’টো একইসঙ্গে কী করে সম্ভব ? 

সদগুরু: নমস্কার, কঙ্গনা। ওই দুটি বিষয়ের মধ্যে তুমি বৈপরীত্য কোথায় পেলে? কর্ম হল আমাদেরই স্মৃতির অবশিষ্টাংশ – শরীর দিয়ে, আবেগ দিয়ে, ভাবনা চিন্তা বা প্রাণ শক্তিকে ব্যবহার করে আমরা যা কিছু করি, তার অবশিষ্ট। অন্য কথায়, এটি তোমারই তৈরি এক জাতীয় অসচেতন (unconscious) সফটওয়্যার। এটি এক ধরনের গভীরে থাকা সুপ্ত স্মৃতি, যা অজান্তেই তোমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিয়ন্ত্রণ করে চলে। 

 

তোমার ভিতরে সর্বদাই কাজ করে চলেছে ভৌত (শারীরিক) স্মৃতি, মন ও আবেগের স্মৃতি এবং প্রাণ শক্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া স্মৃতি – এরা মিলিত ভাবে জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে যখন না জেনেই তুমি এদের অনুমোদন দাও। এই স্মৃতি ভান্ডারটি যত বড়ই হোক না কেন, এটি নির্দিষ্ট পরিধির দ্বারা সীমায়িত। 

কর্ম হল একটি সীমায়িত ক্ষেত্র, কিন্তু এই সীমিত পরিধির মধ্যেই এটি অত্যন্ত কার্যকরী

সুতরাং, কর্ম হল একটি সীমায়িত ক্ষেত্র, কিন্তু এই সীমিত পরিধির মধ্যেই এটি অত্যন্ত কার্যকরী। এটি জীবনের বিভিন্ন দিককে সহজ করে দেয়। এটি তোমাকে স্বয়ংক্রিয় করে তোলে, জীবনের বহুবিধ বিষয়ের প্রতি অনায়াসেই সাড়া দিতে সক্ষম হও তুমি। 

কিন্তু তুমি যদি নিজেকে প্রসারিত করতে চাও, সেক্ষেত্রে সীমানার উপস্থিতি একটি সমস্যা। ধরা যাক, তোমার বাড়ির চারপাশে একটি নির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করা আছে, কিন্তু সেই সীমানাকে যদি তুমি আরও বড় করতে চাও, আগেরটিকে মুছে ফেললেই হয়ে যাবে। কিন্তু ধরো, কোনও কারণে তোমার উপর আক্রমণের ও তোমার জীবন সংশয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং বাঁচার জন্য তুমি চারপাশে একটি দুর্ভেদ্য দূর্গ তৈরি করলে। 

অন্তর্নিবেশ ঘটানোর অর্থ এটা নয় যে, সকলের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে। সমগ্র সৃষ্টির সহজাত প্রকৃতিই হল অন্তর্নিবেশ করা

যদি আক্রমণের সম্ভাবনা থাকে, তুমি দূর্গের মধ্যে নিরাপদ বোধ করবে। কিন্তু আক্রমণের কোনও রকম সম্ভাবনা যদি না থাকে, স্বাভাবিক ভাবেই তুমি ওই দূর্গের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে চাইবে। এবার যখন তুমি নিজেকে প্রসারিত করতে চাইবে, তখন দূর্গের ওই পাথুরে দেওয়ালকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা হবে, ওই শক্ত দেওয়ালের কারণেই তুমি নিজেকে প্রসারিত করতে চাইবে না। 

একই ভাবে, কর্মের স্মৃতি একটি নির্দিষ্ট ধরনের কঠিন দেওয়াল, যা তোমারই তৈরি। ওই দেওয়ালটিকে ক্রমশ আলগা করে নিজের ভিতরে সব কিছুর অন্তর্নিবেশ ঘটানোর ক্ষমতা তৈরি করতে হবে। অন্তর্নিবেশ ঘটানোর অর্থ এটা নয় যে, সকলের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে। সমগ্র সৃষ্টির সহজাত প্রকৃতিই হল অন্তর্নিবেশ করা।

এই সৃষ্টির প্রকৃতিই হল সব কিছুকে অন্তর্নিবেশিত করা – তোমাকে শুধু সচেতন উপলব্ধির মধ্যে আনতে হবে। কর্ম হল তোমার ব্যক্তি “আমি”র স্বভাবজ প্রকৃতি। ওই কর্মের পরিধির সীমাবদ্ধতা নিয়ে তোমাকে সচেতন হয়ে উঠতে হবে

এই যে তুমি বিরাজ করছো, গাছগুলি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে যা ত্যাগ করছে, তুমি তা গ্রহণ করছো। আবার তুমি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে যা ত্যাগ করছো, গাছেরা সেটি গ্রহণ করছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এই লেনদেনের বিষয়ে অবহিত নয়। যদি তুমি সচেতন ভাবে এই আদানপ্রদান অনুভব করতে সক্ষম হও, সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়াটিই অতীব আনন্দদায়ক হয়ে উঠবে তোমার প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে। কিন্তু যদি সচেতন না হও, তখনও গাছেদের নির্গত অক্সিজেন তোমার শরীরকে পুষ্টি জোগাবে ঠিকই, তবে তুমি উপলব্ধি করতে পারবে না।

অন্তর্নিবেশ করার অর্থ কোনও ভাবেই আলাদা কিছু করা নয়। এই সমগ্র সৃষ্টির প্রকৃতি সম্পর্কে তোমাকে অবগত হতে হবে। গাছের ক্ষেত্রে বা মাটির ক্ষেত্রে যা ঘটে, তোমাতেও একই প্রতিক্রিয়া হয়। আপাতত তুমি যাকে “আমি” বলো, সেটা এই পৃথিবীর মাটি থেকেই উদ্গত, যে মাটির উপর দিয়ে তুমি হেঁটে চলে বেড়াও। সুতরাং অন্তর্নিবেশ ঘটানোর নামে তোমাকে আলাদা কিছু করতে হবে না। এই সৃষ্টির প্রকৃতিই হল সব কিছুকে অন্তর্নিবেশিত করা – তোমাকে শুধু সচেতন উপলব্ধির মধ্যে আনতে হবে। কর্ম হল তোমার ব্যক্তি “আমি”র স্বভাবজ প্রকৃতি। ওই কর্মের পরিধির সীমাবদ্ধতা নিয়ে তোমাকে সচেতন হয়ে উঠতে হবে। যদি এই সচেতনতা আসে, বাকীটুকু জীবন নিজেই সামলে নেবে।

সম্পাদকের কথা: যে প্রশ্নের উত্তর দিতে সকলেই অপারগ, যদি এমন কোনও বিতর্কিত বা স্পর্শকাতর প্রশ্ন থাকে অথবা যদি কোনও আপাত কঠিন প্রশ্ন নিজেকে ক্রমাগত বিব্রত করতে থাকে, সেক্ষেত্রে জীবনের সব অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এখানে। সদগুরুকে আপনার প্রশ্ন করুন UnplugWithSadhguru.org.

Youth and Truth Banner Image