ঈশ্বরের পথে – স্বামী গুরুভিক্ষা

ঈশা যোগ কেন্দ্রের এক সন্ন্যাসী, স্বামী গুরুভিক্ষা, সেই অতীন্দ্রিয় পথের কথা বর্ণনা করছেন, যে পথ তাঁকে ঈশাতে নিয়ে এসেছে, আশ্রমের শুরুর দিকের দিনগুলোতে সদ্গুরুর সাথে তার ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোর কথা এবং তাঁর সন্ন্যাসে দীক্ষা।
ঈশ্বরের পথে – স্বামী গুরুভিক্ষা
 

অলৌকিক সাক্ষাৎকার 

স্বামী গুরুভিক্ষা : উনি আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন। গত দশ মিনিট ধরে ওনার বিরাট গভীর অস্বাভাবিক কালো চোখ দিয়ে আমাকে দেখছিলেন। "উনি কি আমাকে ওনার সঙ্গে নিয়ে চলে যাবেন?" – ভয়ংকর এক ত্রাস আমার কোমল হৃদয় থেকে উঠে এলো। পাশে বসে থাকা ঠাকুরদার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আমি কাঁদতে শুরু করলাম। ঠাকুরদা যখন আমাকে সান্ত্বনা দিতে নিচু হয়েছেন, পরের স্টেশন এসে গেল, আর সেই যোগীর মতো দেখতে মানুষটি যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। ঠিক নেমে যাবার আগে উনি আমার কানে ফিসফিস করে বলে গেলেন কার্তিক ঠাকুরের একটা বিশেষ নাম। ঠাকুরদা আর অন্যান্য সহযাত্রীদের বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল আমাকে শান্ত করতে। আমরা যে স্টেশনে নামলাম, আশ্চর্য ব্যাপার, ঠাকুরদা আমাকে নিয়ে যে কার্তিক ঠাকুরের মন্দিরে গেলেন সেটা সেই একই বিশেষ নামের। আমি তখন মাত্র পাঁচ বছর বয়সী – কিন্তু সেই মুখ, সেই মুখের তীব্রতা যার সাথে সদ্গুরু শ্রী ব্রহ্মের সাদৃশ্য আছে – এখনো আমার স্মৃতিতে খোদাই করা আছে, যেন গতকালের ঘটা ঘটনা। হতে পারে, হয়তো এটা আমার মধ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা বিকাশের সূত্রপাত ছিল। 

বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স তিন বছর, ঠাকুরদা যখন মারা গেলেন তখন আমি কুড়ি বছরের। পারিবারিক বিষয় সম্পত্তি এবং অন্যান্য টাকাপয়সা সংক্রান্ত মামলায় আমি জড়িয়ে পড়ি, জীবনের খুব প্রাথমিক পর্যায়ে। বয়স অনুপাতে খুব তাড়াতাড়ি পরিণত হয়ে গিয়েছিলাম। এই সময়তে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল যোগী রামসুরত কুমারের সঙ্গে। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন উন্নতস্তরের মানুষ। ওনার কৃপা আমার জীবনের বেশিরভাগ সব জাগতিক বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। পড়াশোনা শেষ করবার পর আমি, আমার খুব পছন্দের কাজ – কনস্ট্রাকশনের ব্যবসায় যেতে চাইলাম – কিন্তু যোগী রাম পরামর্শ দিলেন আমাদের পারিবারিক মহাজনী এবং টাকা লেনদেনের ব্যবসা চালিয়ে যেতে। তখন আমি কতটুকুইবা জানতাম যে একদিন এই সামান্য দক্ষতা ক্রমবর্ধমান ঈশার কাজকর্ম পরিচালনা করতে এত কাজে দেবে, ১৯৯২ সালের শেষভাগে আমি যার অংশ হয়ে উঠেছিলাম। 

প্রথম পাঁচজনের সংঘ

কিশোর বয়সে আমি অত্যন্ত যোগ অনুরাগী হয়ে উঠেছিলাম। আমি সদগুরুর ক্লাস করেছিলাম শুধুমাত্র এর প্রতি আমার ভালোবাসা থেকে। যাইহোক ১৯৯২ সালে সামিয়ামা করার পরে, উপলব্ধি করলাম যে আমি সদগুরুকে ত্যাগ করতে পারব না, আমাকে ওনার আশপাশে থাকতেই হবে। সমস্ত তামিলনাড়ু জুড়ে ওনার ক্লাসে আমি সক্রিয়ভাবে স্বেচ্ছাসেবা শুরু করলাম এবং সে বছরই সিঙ্গানাল্লুরের অফিসে চলে গেলাম। যে পাঁচজন আমরা প্রথম সর্বক্ষণের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এসেছিলাম তাদের মধ্যে আমি সব থেকে বয়স্ক ছিলাম। আমরা এক পরিবারের মত ঝগড়াঝাটি করতাম এবং থাকতাম। সদগুরু আর ভিজ্জি দিদি আমাদের জন্য প্রায়ই রান্নাবান্না করতেন, ঝামেলায় মধ্যস্থতা করতেন এবং অতি তুচ্ছ প্রয়োজনের খেয়াল রাখতেন – এমন কিছু যা বাবা-মায়েরাও হয়তো কখনো কখনো করে উঠতে পারেন না। সেই সময়টা ছিল আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়। 

সদগুরু যে কোন ব্যাপারে আমার সঙ্গে মজা করার কোন সুযোগ হারাতেন না। একবার, যখন আমার তৈরি করা কিছু কাগজে সই করছেন তখন সদগুরু একটা ভুল খুঁজে পান। উনি শুধু নিজে ভুলটা শুধরে নিয়ে পরের কাগজে সই করে যেতে লাগলেন। "কেন তুমি ওকে ভুলটা দেখিয়ে দিলে না, আমাদের সবার সাথে যেমন করো?" ভিজ্জি দিদি মজা করে আমার সামনেই জিজ্ঞাসা করলেন ওনাকে। " আমাকে যদি ওর ভুল দেখাতে হয় তাহলে সেগুলো নিয়ে ওর সাথে কথা বলতে আর বোঝাতে সারা দিন কেটে যাবে!" সদগুরু সরস মন্তব্য করে সই করে যেতে লাগলেন। আমি প্রতি এই মনোযোগ আমি বেশ উপভোগ করতাম কিন্তু তখনও দ্বন্দ্বে ছিলাম যে কে আমার গুরু – যোগী রামসুরতকুমার না সদগুরু? শীঘ্রই সেটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।

একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা এবং এক সন্ধিক্ষণ 

১৯৯৩ সালের শেষের দিকে, আমি নিজের আদি শহরে অল্প কিছুদিনের জন্য যাব বলে ঠিক করছিলাম। "দুজন মানুষের সঙ্গে তোমার দেখা হবে যারা আমার কথা জিজ্ঞাসা করবে, বলো আমি ভালো আছি আর আমি তাদের কথা জিজ্ঞাসা করেছি।" আমি যখন যেতে চলেছি তখন হঠাৎই বললেন , এবং যখন আমি বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছি ঠিক তার আগে আরও আরেকবার বললেন । আমি এই কথাটা ঠিক কি, তা বুঝতে পারলাম না কিন্তু প্রত্যেকটা সময় যখন কেউ আমার সঙ্গে কথা বলছিল আমি খুব সতর্ক হয়ে যাচ্ছিলাম – তা সে ট্রেনেই হোক, বাড়িতে বা রাস্তায় বা দোকানে যেখানেই হোক। একটা দিন কেটে গেল, কেউই আমাকে ওনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করল না, কিন্তু আমি খুব সতর্ক হয়ে ছিলাম। পড়ের দিন আমি আমার কাকার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, প্রথমেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন "যোগ কেমন চলছে?" কথাটা যেভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, হতেই পারে তিনি সদগুরুর কথা বলছিলেন। যোগ আর জাগ্গী কি এক জিনিস? আমি এক মুহুর্ত ভাবলাম তারপর উত্তর দিলাম যোগ ভালোই চলছে, স্বাভাবিকভাবে আমি বলতে পারলাম না যে "যোগও আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছে!"! 

"আরো একজন বাকি আছে, হতে পারে আরো দুজন," বাড়িতে কাটানো বাকি দুটো দিন এই ভাবনাতেই ব্যস্ত ছিলাম। কিছুই ঘটল না। কোয়েম্বাটুরে ফেরার পথে আমি মাদুরাইতে আমার তুতো বোনের বাড়িতে থামলাম। "জিগ্গী কেমন আছেন?" আমার তুতো বোনের স্বামী জিজ্ঞাসা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি উত্তর দিলাম,"জাগ্গী ভালো আছেন" আর তারপর যোগ করলাম "তিনিও আপনার খোঁজ নিয়েছেন।" জাগ্গীও ওনার খোঁজ নিয়েছেন শুনে উনি অবাক হয়ে গেলেন। ওনাকে এত অস্বস্তি বোধ করতে দেখে আমি প্রাণভরে হাসলাম। ঠিক আছে, একটা ছিল যোগ, একজন জিগ্গী, কিন্তু জাগ্গী নয় – সিঙ্গানাল্লুরে না পৌঁছানো পর্যন্ত একথা ভাবতে থাকলাম। 

আমি এটা আর ধরে রাখতে পারলাম না ভিজ্জি দিদিকে সব কথা বলে দিলাম। আসলে যা ঘটেছে তাতে উনিও খুব অবাক হলেন , সদগুরু কেন এটা বলেছিলেন। পরে ঐদিন, আমি সদগুরুর ক্লাসে স্বেচ্ছাসেবার জন্যে গেলাম। "আমি তোমাকে যা বলি, তার একটা কাজও তুমি ঠিক করে করতে পারো না," যেই মাত্র আমরা কিছু মুহূর্তের জন্য একা সময় পেলাম অমনি সদগুরু উচ্চস্বরে অভিযোগ জানালেন আমাকে। কি কাজ আমি ঠিকমত করিনি, আমি ভাবলাম। কিন্তু ঠিক তার পরেই হাসিতে ফেটে পড়লেন, বললেন, "ভিজ্জি আমাকে সব বলেছে!" 

আজ পর্যন্ত, আমি জানিনা যে ব্যাপারটা আসলে কি নিয়ে ছিল, কিন্তু আমার সরল মনে, তিনি যে আগে থেকে কোন ব্যাপার দেখতে পান, তা একটা অলৌকিক ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল, আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে সদগুরু আমার গুরু। এই ঘটনা জীবনে সদগুরুর প্রতি আমার অঙ্গীকারের পক্ষে এক সন্ধিক্ষণ ছিল। 

সদগুরুর বিনম্রতা এবং অঙ্গীকার

১৯৯৩ এর ফেব্রুয়ারি মাসে সদগুরু আশ্রমের বিষয়টা পাকা করে ফেললেন। তিনি তামিলনাড়ুর অনেক সাধকের বাড়ি গেলেন অর্থ সাহায্য চাইতে। একবার আমার সুযোগ হয়েছিল এই কারণে সদগুরুর সঙ্গে কারুর যাবার। সদগুরু অর্থ সাহায্য চাইছেন, সেটা দেখা আমার পক্ষে অসহনীয় ছিল। অনেকে অনেক বেশি দিলেন, কেউ কেউ দিলেন সামান্য, কিন্তু সদগুরু প্রত্যেকের কাছে সমান নিষ্ঠার সঙ্গে নত হলেন।

হোলনেস প্রোগ্রামে থাকার অভিজ্ঞতা 

১২ই জুলাই ১৯৯৪ সাল, আমরা হোলনেস প্রোগ্রামের জন্য আশ্রমে যাব বলে সদগুরুর গাড়ি অনুসরণ করছিলাম। এত জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল যে ইরুত্তুপল্লামের প্রচন্ড গতিতে বয়ে যাওয়া ছোট নদী উপচে উঠার জন্য আমরা কেউ একে পার হয়ে যেতে পারছিলাম না। আমাদের আলান্দুরাই তে কিছু স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে থেকে যেতে হল আর হোলনেস প্রোগ্রামকে একদিনের জন্য পিছিয়ে দিতে হল। ঈশার ইতিহাসে এটা প্রথম এবং একমাত্র সময় যখন কোন প্রোগ্রামকে একদিন পিছিয়ে দিতে হয়েছিল। 

আমার জন্য হোলনেস প্রোগ্রাম অতিজাগতিক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ব্যাপারে ছিলনা। (যেমন অন্য অনেকের জন্যে ছিল) এটা আমায় কেবল নিজের মধ্যে অস্তিত্তের এক আলাদা স্তরে নিয়ে গেল – তীব্র ভাবে বাঁচার। প্রথম তিরিশ দিনের পরে সদগুরু হোলনেসে অংশগ্রহণকারীদের দুই ভাগে ভাগ করে দিলেন। আমাদের মধ্যে সাতজন "আবাসিক " বিভাগে। অন্যরা 'শিক্ষাদান'' বিভাগে, যারা ঈশার যোগ শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলেন। সদগুরু তাঁর বেশিরভাগ সময় "শিক্ষাদান" বিভাগের সঙ্গে কাটাতেন, যখন আমরা সাতজন শুধুমাত্র সাধনা, বাগানের কাজ আর ছোটখাটো কাজকর্ম করতাম আর থাকতাম। কিছুদিন পরে আমাদের যেন নিজেদের বাতিলের দলে বলে মনে হচ্ছিল আর সদগুরু আমাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন না দেখে মন ভেঙে যাচ্ছিল। "সদগুরু, দয়া করে আমাদের সাথেও কিছু সময় কাটান",একদিন আমি ওনার কাছে প্রায় কেঁদে ফেলে মিনতি করলাম। 

সদগুরু আমার দিকে অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে তাকালেন, আর পরের দিনই তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তিনি 'ঝুঁকে পড়া গাছটার' নিচে বসলেন, আর আমরা সাতজন তাঁকে ঘিরে বসলাম। " যা কিছুই করছো সেটা ভালবাসার সঙ্গে করো। এমনকি যখন পার্থেনিয়ামের আগাছা উপরাচ্ছ তখনো তা ভালোবাসা নিয়ে করো, আর আমি তোমাদের সাধনা এবং আত্মজ্ঞান লাভের দায়িত্ব নেব," সদ্গুরু সেই সাক্ষাতের সময় আমাদের বলেছিলেন। সেই প্রথম আমরা আত্মজ্ঞান লাভের প্রতিশ্রুতি তার কাছ থেকে আদায় করেছিলাম! 

হোলনেস প্রোগ্রাম চলাকালীন একটা সময়, আশ্রমবাসীরা ভবিষ্যতে কি নিয়ম অনুসরণ করে চলবেন সেই বিষয়ে আলোচনা করবার জন্য সদগুরু অংশগ্রহণকারীদের ডাকলেন। আমি নিয়মের এই দ্রুত প্রসারিত তালিকা দেখে হতভম্ব আর উদ্বিগ্ন হয়ে গেছিলাম। এটা আমাকে পুরোপুরি ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। সেই সন্ধ্যেবেলা আমি সদগুরুর সাথে ওনার ঘরের দিকে অনুসরণ করলাম। অন্ধকার ছিল আর আমার মনে আছে উনি একটা টর্চ নিয়েছিলেন। আমরা ওনার দরজায় থামলাম। উনি আমার দিকে তাকালেন এবং আমি ঝোঁকের বশে বললাম, "জাগ্গী আমি কোন নিয়ম চাইনা।" তিনি আমার মুখে টর্চের আলো ফেললেন। উনি নিশ্চয়ই আমার চোখে থাকা জল দেখেছিলেন। তিনি নম্র ভাবে, অতন্ত নম্র ভাবে বললেন, "ঠিক আছে তোমার জন্য কোন নিয়ম নয়।" যদিও এখন আমি আশ্রম এর সমস্ত নিয়মই মেনে চলি, সদগুরু এত কোমলভাবে আমার শিশুসুলভ প্রতিক্রিয়াটি সম্বোধন করেছিলেন সেটা এখনও আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। 

হোলনেস প্রোগ্রাম শেষ হয়ে যাওয়ার ঠিক পরেই আমরা লেগে পড়লাম সদগুরুর ধ্যানলিঙ্গের প্রাণপ্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে। সেই সব দিন ছিল জোরদার কাজকর্ম এবং গভির সাধনার। আমি দেখাশোনা করছিলাম আইনগত এবং আর্থিক দিকগুলোর, আর ডোম এবং পরিক্রমা তৈরী করতে ব্যবহার হয় এরকম বিভিন্ন জিনিসপত্র চিহ্নিত করা আর কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তারপর ১৯৯৬ সালের মহাশিবরাত্রিতে ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত হলাম – ব্রহ্মচারীদের দ্বিতীয় দল। 

আমি কি সত্যিই জানতাম যে মহাসমাধি কি?

১৯৯৭ সালের ভিজ্জি দিদির মহাসমাধি যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত ছিল । বিশেষতঃ আমি খুব বিমর্ষ হতে পড়লাম। কারণ প্রথমত, আমার সাথে ওনার সম্পর্কটা খুব সুন্দর ছিল – উনি ছিলেন আমার বিশ্বস্ত বন্ধু। যে ব্যাপারটা আমি সদগুরুকে বলতে পারতাম না, ওনার সাথে বলতাম। আর দ্বিতীয়ত, যদিও সদগুরু এবং ভিজ্জি দিদি অনেক আগে থেকেই এটা ঘটবে বলে জানিয়েছিলেন, আমি কোনদিন বিশ্বাস করিনি যে এটা সত্যিই ঘটতে পারে। আমার নিজেকে পুরোপুরি মূর্খ বলে মনে হচ্ছিল। 

সেটা ছিল ১৯৯৬ এর অগাস্ট মাস যখন আমি প্রথম শুনলাম, ভিজ্জি সদগুরুকে বলছেন যে তিনি চলে যেতে চান। আমরা ধ্যানযাত্রার পর ট্রেনে ফিরছিলাম, দিল্লী থেকে কোয়েম্বাটুরে । "ওনারা সচরাচর যেমন করে থাকেন সেরকম মজা করছেন" আমি ভেবেছিলাম। আরেক সময়, সদগুরু আমাকে একদিন টি-ব্লকের বাইরে থামালেন এবং বললেন ভিজ্জি মহাসমাধি নিতে চাইছেন, উনি জানেন না যে কিভাবে ওনাকে এই পদক্ষেপ না নেওয়ার কথা বোঝাবেন। এমনকি তখনও আমি এটাকে গুরুত্ব দিইনি। 

ওনার মহাসমাধির এক সপ্তাহ আগে সদগুরু কোন একটা কাজে আমাকে মাইসোরে আসতে বললেন । ভিজ্জি দিদিকে আমার সেসময় দেখতে অন্যরকম লাগছিল। "আপনাকে অন্যরকম লাগছে দেখতে, ভিজ্জি। কি ব্যাপার?" আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম। "দেখো, এমনকি ওর ও মনে হছে যে আমাকে অন্য রকম দেখাচ্ছে"। উনি সদগুরুর দিকে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরলেন বলার জন্যে। "এর কারণ, উনি শিগগিরই মহাসমাধি নিতে চলেছেন।" সদগুরু আমাকে উত্তর দিলেন। তবুও – তবুও আমি ভাবিনি যে এটা সত্যিই ঘটবে। কারণ আমি জানতাম যে মহাসমাধি কি – এতে আমার সংশয় ছিল, "কিভাবে ভিজ্জি দিদি আধ্যাত্মিক সাধনার সেই সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারবেন?"  

তাই আমি যখন শুনলাম যে তিনি চলে গেছেন, আমার মনে হল যেন আমার উপরে বোমা পড়েছে। আমার ক্ষতি ব্যাখ্যা করার মত কোন ভাষা আমার নেই, আমার মধ্যে কোথাও একটা তার প্রতি ঈর্ষার ভাবও হল। 

তীব্রতার আরেক ধাপ 

যদিও ক্ষতিটা ছিল অবর্ণনীয়। কিন্তু এটা নিয়ে বসে থাকার মত সময় আমার ছিল না। ধ্যান লিঙ্গের প্রাণ প্রতিষ্ঠার কাজ আমাদের সবাইকে ব্যস্ত করে রেখেছিল। ব্রহ্মচারী হিসাবে ওই সময়গুলো ছিল আমার সবথেকে প্রগাঢ় সময়। ভিজ্জি দিদির মহাসমাধির চার মাস বাদে সদগুরু আমাকে অন্ধ্রপ্রদেশের কদ্দাপাহতে একটা মন্দিরে প্রায় চারশজন সাধকের যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বললেন। আমরা কদ্দাপাহতে যাবার আগে, একজন সাধক তার সোনার গয়না দান করলেন সেই মন্দিরের লিঙ্গের জন্য সোনার আবরণ বানিয়ে দেওয়ার জন্যে। স্বর্ণকারের কাছ থেকে এই আবরণ আশ্রমে নিয়ে আসা হল একটা ছোট শোভাযাত্রা করে, তারপরে একে কুদ্দাপাহতে নিয়ে যাওয়া হল লিঙ্গকে অলংকৃত করতে। এই কুদ্দাপাহতেই সদগুরু প্রথমবার তাঁর গুরুদেবের কথা বলেন।  

গত জন্মে যে মণ্ডপে বসে তিনি ধ্যানলিঙ্গের পরিকল্পনা করেছিলেন সেই একই মন্ডপে তিনি সেই রাত্রে সমস্ত ব্রহ্মচারীদের এক শক্তিশালী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেলেন। সেই প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, অদ্ভুত ভাবে আমার হাত ওঠানামা করতে শুরু করেছিল, আর দেখলাম সারারাত ধরে আমি প্রচন্ড জোরে আওয়াজ করছি, হাতির ডাকের মতো। আমি এই স্থিতিতে চলে যেতে লাগলাম পরবর্তী কয়েক মাস যেকোন শক্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতেই। সুতরাং আমার মধ্যের তীব্রতা আরও একটা বড় ধাপ এগিয়ে গেল এই কুদ্দাপাহ মন্দির দর্শনের পর। 

"ধ্যানলিঙ্গ কি বলছে আপনাকে?" 

১৯৯৯ এর ২৪শে জুন, তাঁর পূর্ণ মহিমায়ে ধ্যানলিঙ্গের প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। ২০০০ সালের কোন এক সময়, আমি প্রথমবার লিঙ্গ অর্পণম করি। একদিন যখন টি-ব্লকে ফুল তুলছিলাম সদগুরুর সাথে দেখা হয়ে গেল। "তো ধ্যানলিঙ্গ কি বলছে তোমাকে?" জিজ্ঞেস করলেন উনি। আবার আমি দ্বন্দ্বে পড়লাম, কি বলতে হবে বুঝতে পারলাম না, বলেই ফেললাম, "কিছু না!" উনি কি বলেছেন তার তাৎপর্য পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম। তার আগে আমি অবশ্যই মন্দিরে ভক্তিভরে সেবা করতাম, এটা আমার কাছে ছিল এক মন্দির – যে মন্দির সদগুরু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু সদগুরু এটা জিজ্ঞাসা করার পরে, এটা আমার মনে উদয় হল যে ধ্যানলিঙ্গ হল সদগুরু, সদগুরু হলেন ধ্যানলিঙ্গ। উভয়ই তারা আমার কাছে এক বলে মনে হতে লাগলো। 

আমার প্রথম দিকের পথ চলায়, আমার অঙ্গীকার ছিল শুধু সদগুরুর কাছে। আমার এখানে থাকার কারণ এবং ব্রহ্মচর্য নেওয়ার কারণ ছিল যে আমি সদগুরুকে ছাড়া থাকার কথা ভাবতে পারতাম না। কিন্তু লিঙ্গ অর্পনমের পরে, ধ্যানলিঙ্গ ততটাই বড় এক উপস্থিতি হয়ে গেল। এমনকি আজও যখন আমি বাইরের লোকজনের সাথে লেনদেন করায়ে ক্লান্ত হয়ে যাই, বিশেষত আর্থিক ব্যাপারে, আমি এসে ঘন্টা দুই ধ্যানলিঙ্গে বসি আর ভেতরে পুরোপুরি সুস্থির হয়ে যাই। 

আধ্যাত্মিকতার পূর্ণবিকাশের দিকে এক যাত্রা 

আমার জীবন এক সাধক হিসেবে ভীষণ মাত্রায়ে বিকশিত হয়ে ওঠে, যখুন আমার সন্ন্যাসে দীক্ষা হয়। ২০০৩ সালে ব্রহ্মচারীদের সাথে এক সম্মেলনে সদগুরু আমাদের দশজনকে সন্ন্যাসে দীক্ষিত করেন এবং এখন আমাদের যে নামে ডাকা হয় সেই নামে আমাদের নাম পরিবর্তিত করেন। আমি সেই সময়ে এর অর্থ প্রকৃত ভাবে বুঝতে পারিনি, কিন্তু শিগ্রীই দেখলাম যে কিছু ভিত্তিগত পরিবর্তন আমার মধ্যে হয়েছে। আমার অনেক বাধ্যতামূলক আচরণ একেবারে চলে গেছে আর আমি আমার পথে পুরোপুরি ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। তখন থেকে, আমি অন্তরে অনুভব করি যে আমি মুক্ত, কিন্তু এটাও জানি যে আমি তা নই। 

শেষ করবার আগে, এটা জানাতে চাই যে, আমি দেখেছি আশ্রমের মানুষজন সত্যিই চমৎকার। যখন আমার বাইরের লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ হয়, দেখতে পাই তাঁরা কিছু সামান্য জিনিসের সাথে কিভাবে আটকে আছেন – টাকাপয়সা, সম্পর্ক, পদমর্যাদা, বাড়িঘর, গাড়ি, ইত্যাদি, কিন্তু এখানে এরকম নয়। হয়তো এখনো আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি আমাদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে, যা দিয়ে প্রকৃতি আমাদের মুড়ে রেখেছে, কিন্তু আমরা সচেতনভাবে বা অচেতন ভাবে প্রচুর পরিমাণে অপ্রয়োজনীয় বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েছি। এইরকম সব মানুষজন, ধ্যানলিঙ্গ এবং অবশ্যই আমার গুরু – এঁদের সকলের মাঝে বাস করতে পারাটা আমার কাছে এক আশীর্বাদ।