ঈশ্বরের পথে - মা গম্ভীরী

এখানে, মা গম্ভীরী এক তরুণী উচ্চাকাঙ্ক্ষী পাইলট থেকে একজন একনিষ্ঠ সন্ন্যাসিনী হিসেবে রূপান্তরের কাহিনী অকপটে বর্ণনা করেছেন, সদগুরুর একজন যোগ শিক্ষক থেকে গুরু হিসেবে রুপান্তর, কিভাবে তাদের চোখের সামনে ধ্যানলিঙ্গের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা সদগুরুর শরীরকে প্রভাবিত করেছিল, এবং শুরুর দিনগুলো থেকে আজ পর্যন্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন।
blog article | on the path of the divine maa gambiri
 

মা গম্ভীরী: "দুঃখিত, পার্কিংয়ের এই জায়গাটি যাজ্ঞির জন্য সংরক্ষিত," স্বেচ্ছাসেবক বিনীতভাবে আমাকে জানালেন। "একদম অনুচিত, " আমি এক গলি থেকে অন্য গলিতে পার্কিংয়ের জায়গা খুঁজতে খুঁজতে বিড়বিড় করে অভিযোগ করলাম। আমি কার্যত আমার বোনের জন্য এসেছিলাম, সে এই আশায় যোগ শিখতে এসেছিল যে এটা তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা দূর করবে। কোনভাবে তাকে সেই স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়ে আসার দায়িত্বটি আমার উপড়েই পড়েছিল, সুতরাং আমিও ক্লাসটি তে যোগদান করলাম । একজন কর্মচঞ্চল সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ, পাইলট হবার জন্য প্রশিক্ষণরত মেয়ে হিসেবে, যোগ এবং এই ক্লাসটা নিয়ে আমি একদমই উৎসাহিত ছিলাম না ।

সুতরাং আমি ক্লাসটায় বদমেজাজী হয়ে বসেছিলাম, আশা করছিলাম জিম প্রশিক্ষকের মত কেউ একজন আসবে এবং আমাদের কিছু যোগের অঙ্গভঙ্গি করে দেখাবে। আমাকে হতাশ করে কয়েক মিনিট পর সাদা কুর্তা ও ধুতি পরিহিত একজন দাঁড়িওয়ালা ভদ্রলোক অত্যন্ত নম্রভাবে হেঁটে ক্লাসে প্রবেশ করলেন। শুরুটা একদমই অসাধারণ ছিল না। যদিও সদগুরুর কণ্ঠস্বর আমাকে মোহিত করেছিল, তাও আমি খুব বেশি মনোযোগ দিইনি। তার ওপর পরের দিন আমি আরও আগে পৌঁছে সদগুরুর গাড়ি রাখার জায়েগটা দখল করে নিয়েছিলাম। এবং তাই জন্যে অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে আমি ক্লাসে এসে বসলাম, কিন্তু দ্বিতীয় দিনটি আমাদের দুজনের জন্যই ভীষণ অন্যরকম ছিল। বাড়ি ফেরার পথে আমরা সাধারণত অনেক কথা বলতাম, কিন্তু সেদিন খুব কম কথা বলেছিলাম। তৃতীয় দিন, সদগুরুর গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা ফাঁকা ছিল, কিন্তু আমি সেটা না ব্যাবহার করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ওই দিন, যত্নসহকারে বসলাম, সম্পূর্ণ মনোযোগের সাথে প্রত্যেকটি কথা শুনলাম। আমার বিস্ময়, সেদিন ক্লাসের শেষে তিনি আমার কাছে এলেন এবং সাধারণভাবে আমার আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলেন।

ওই রাতে আমি ঘুমাইনি

আধ্যাত্মিকতার পথ, আত্মজ্ঞান লাভ অথবা গুরু কাকে বলে সেই সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিল না। এবং আমি জানতাম না সদগুরু কে, কিন্তু অনুভব করেছিলাম যে আমি তাঁকে চিরকালই চিনি। সেদিন থেকে একটা জিনিস আমার মধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছিল যে এই পথ, সে যাই হোক না কেন, আমার জীবন হবে, কিন্তু আমি জানিনা কিভাবে। সেদিন থেকে সক্রিয়ভাবে আমি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে শুরু করলাম। যেহেতু আমি অত্যন্ত অল্পবয়স্কা ছিলাম, আধ্যাত্মিক পথের পথিক হবার সঠিক অর্থ আমি বুঝেছি কিনা, সেটা ভেবে আমার বাবা-মা উদ্বিগ্ন ছিলেন। সুতরাং তারা সদগুরুর সঙ্গে দেখা করলেন কি হচ্ছে সেটা বোঝার জন্য। সেই সাক্ষাতের পর সদগুরু আমাকে উপদেশ দিলেন তিন মাসের একটি ছুটি নেবার জন্য এবং দেখতে বললেন আমি যা সত্যিই চাই তা এটা কি না। আমার বাবা-মা আমাকে যুক্তরাজ্যে পাঠিয়ে দিলেন, কিন্তু অবশ্যই, আমি নিজের কাছে সত্যিকারের স্পষ্ট ছিলাম, এবং ৯০ দিনের ‘হোলনেস’ প্রোগ্রামটির জন্য সময়মতো ফিরে এলাম।

আমি আমার পিতা-মাতার কাছে কৃতজ্ঞ, আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানোর জন্য এবং এই সফরে আমাকে আশীর্বাদ করার জন্য।

যোগ শিক্ষক থেকে গুরু

নব্বই দিনের হোলনেস প্রোগ্রামটির সময় আমি সদগুরুকে যেভাবে দেখেছিলাম সেটা তাঁর সাথে আমার সম্পর্ককে অনেক দিক থেকে পরিণত করেছিল। প্রত্যেকদিন তাঁকে অন্যরকম দেখাত এবং সম্পূর্ণ আলাদা তেজ বহির্গত হত। প্রথম ত্রিশ দিনের প্রত্যেকদিন তিনি একটি নতুন কিন্তু, অগ্নিসম সাধনা করাতেন। আমাদের মধ্যে অনেকেই সাধারণ অনুভূতির বাইরের জীবনকে উপলব্ধি করেছিলেন। নব্বই দিন অতিক্রান্ত হলে আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে আমরা বন্ধু থেকে শিষ্য হয়ে অনুরক্ত সেবকে পরিণত হয়েছি, একইভাবে সদগুরুর ব্যক্তিত্বও যোগ শিক্ষক থেকে অতীন্দ্রিয়বাদী হয়ে একজন গুরু হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। যদিও আমাদের মধ্যে অনেকেই সেটা ঠাহর করতে পারেননি, তবে না বুঝতে পারলেও সেটা ঘটেছিল। হোলনেস-এর পর আমি সাধারনভাবে একজন সার্বক্ষণিক আবাসিক হিসেবে থেকে গেলাম- এটা আর কোনো পছন্দ বা অপছন্দের ব্যাপার ছিল না। খুব শীঘ্রই আমি এই পথে বিকল্পহীনভাবে যাবার স্বাদ উপলব্ধি করলাম।  

নিজের ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া

‘হোলনেস’ প্রোগ্রামটির পর আমার শক্তি এমনভাবে পূর্ণরূপে প্রকাশিত হল যে আমি প্রত্যেকদিন আনন্দের সর্বোচ্চ শিখরে এবং দুঃখের সর্বনিম্ন সীমানায় উপনীত হচ্ছিলাম। একজন কুড়ি বছরের মেয়ের জন্যে কখনও কখনও সেটা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে উঠছিল। এমন একদিন এলো যখন আমি অনুভব করলাম যে আমি আমার মধ্যে নরকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছি, তখন আমি সাহায্যের জন্য সদগুরুকে ফোন করলাম। "আমি তোমাকে সব সাধনাই দিয়েছি যা তোমাকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনতে পারে", তিনি এটাই বলে ফোনটি রেখেদিলেন। আমি সেটার সম্পর্কে ভাবলাম এবং আমার নিজেস্ব সাধনার সময়তালিকা তৈরি করলাম। পরবর্তী আটচল্লিশ দিনের জন্য সকালের সাধনা এবং খাবারের পর, সকাল সাড়ে দশটা থেকে সন্ধ্যে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত, আমি একটি নিম গাছের নিচে একটি পাথরের উপর বসতাম, যাকে আমরা শিবালয় বলতাম, এবং তিন ঘন্টা ওম স্তব করতাম তারপর তিন ঘন্টার সুখক্রিয়া সমাপ্ত হলে সাম্যামা ধ্যান করতাম। মাটিতে পা রাখতাম, কেবল যখন সদগুরুর ‘প্রেসেন্স’ এর সময় হত (সদগুরু ‘প্রেসেন্স’ ৬:২০তে ) এবং সন্ধ্যের সাধনার জন্যে। সাম্যামা অনুসৃত এই সাধনা আমার মধ্যে এমন একটি আভ্যন্তরীণ ভারসাম্য এনেছিল যে আজ পর্যন্ত এটা আমাকে অনেক রকম পরিস্থিতির মধ্যে ধারণ করে নিয়ে যায়। এটা আমার জীবনের এমন একটি সন্ধিক্ষণ ছিল যা আমাকে এই পথের মূল সূত্রে আবদ্ধ করেছিল। আমি ১৯৯৬ সালে ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত হই।  

ভিজ্জি দিদির তৈরী বিসিবেলে ভাত (একসঙ্গে মুসুর ডাল ও ভাতের তৈরী একটি পদ)

শুরুতে আমরা মাত্র পাঁচজন লোক আশ্রমে ছিলাম। আমাদের প্রিয় পাট্টি আমাদের জন্য কাঠের উনুনে রান্না করত। একটি ছোটো নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তলা চালা পরিনত হত রান্নাঘর ও খাবার ঘর হিসেবে। আমি পাট্টিকে তার কাজে সাহায্য করতাম। সদগুরু যখনই আশ্রোমে থাকতেন, আমাদের সবজি কাটার কাজে সাহায্য করতেন। একদিন ভিজ্জি আমাদের জন্য বিসিবেলে ভাত রান্না করেছিলেন। তিনি সামান্য প্রশংসার আশায় সদগুরু কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রান্নাটা কেমন হয়েছে এবং সদগুরু উত্তর দিয়েছিলেন, "হুমমমম….. খুব সুন্দর হয়েছে সাম্বার সাদম টা! " তখুনই ভিজ্জি একদম হতাশ হয়েগেল। তাদের খুনসুটি আমরা ভীষণভাবে উপভোগ করতাম।

ভিজ্জি এবং আমার মধ্যে প্রথম থেকেই একটা ভাল বোঝাপড়া/সুসম্পর্ক ছিল । যখনই তিনি আশ্রমে থাকতেন, আমরা একসাথে আমাদের সাধনা করতাম। যেদিন তিনি দেহত্যাগ করেন, কার্যত সারাদিনই আমি তার সঙ্গে ছিলাম।

১৯৯৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি, পূর্ণিমার দিন, সদগুরু আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে ভিজ্জির সাথে থাকতে বললেন। ভিজ্জি একটি নির্দিষ্ট সাধনায়ে ছিলেন, সুতরাং আমি হয় তার সঙ্গে বসে ধ্যান করছিলাম অথবা ব্রহ্মচারীদের জন্য রান্নার কাজে তাকে সাহায্য করছিলাম। পূর্ণিমার দিনে তিনি আমাদের খাবার পরিবেশন করতেন। কিন্তু, আমাদের প্রথম পর্বের ধ্যান সমাপনের পর, তিনি সোজা সদগুরুর ডেস্কের কাছে গেলেন এবং একটি ডায়েরি তুলে নিলেন, আর সেটা আমার কাছে দিয়ে বললেন, "এরপর থেকে তুমি যাজ্ঞির সব সাক্ষাতের তারিখ এখানেই লিখে রাখবে এবং সেগুলো তাঁকে পাঠাবে।" আমি মৃদু প্রতিবাদ জানালাম। আমি সদগুরুর সাক্ষাতের তারিখ সব সময় ভিজ্জিকে জানাতে স্বচ্ছন্দ ছিলাম এবং তিনি সদগুরুকে জানাতেন। এই ব্যবস্থা খুব ভালোভাবে কাজ করছিল, সুতরাং আমি বুঝতে পারছিলাম না যে কেন উনি তা পাল্টাতে চাইছিলেন। কিন্তু তিনি জোর করলেন। আমি এটা ভেবে সেটা নিলাম যে আমি এমনিতেও কাজটা করছি না। সেদিনই সন্ধ্যেবেলা তার দেহত্যাগের মহান পরিকল্পনা সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলাম।

আজ পর্যন্ত সেই ডাইরিটি আমার সাথে আছে। শুধুমাত্র একটি স্মৃতি হিসেবে নয়, কিন্তু একটি অযুত সম্ভাবনা যা এখানে আছে, তার স্মারক চিহ্ন হিসেবে। হতাশা এবং নিরাশার মুহূর্তে, এটা আমাকে চালিত করে।

প্রাণ-প্রতিষ্ঠার মূল্য

ইতিমধ্যে সদগুরু ধ্যানলিঙ্গের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করার জন্য শক্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কিত কাজ শুরু করেছিলেন এবং এর কি অর্থ তার সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। সদগুরু আমাদের এই ঘটনার জন্য তৈরি করছিলেন যে সম্ভবত প্রাণ-প্রতিষ্ঠার পর তিনি দেহত্যাগ করবেন - প্রকৃতপক্ষে, তিনি আগের থেকেই নিজের সমাধি তৈরি করে রেখেছিলেন। আমরা নিজেদের মধ্যে অশান্তি এবং অনিশ্চয়তায়ে ছিলাম; কারণ আমরা চেয়েছিলাম ধ্যানলিঙ্গের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা হোক, কিন্তু সদগুরুর জীবনও আমাদের কাছে মূল্যবান ছিল। সুতরাং এই অবস্থায় কি করা উচিত সেটা না জেনেই, আমরা ব্রহ্মচারীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যেকোনো ভাবেই হোক না কেন আমরা তাঁকে স্বাচ্ছন্দ্য দেব। আমরা সবাই খুব অল্পবয়স্ক ছিলাম, সুতরাং প্রথমেই আমরা ঠিক করেছিলাম যে আমরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবো না এবং তাঁকে বিরক্ত না করে ঝামেলাগুলো নিজেদের মধ্যেই মিটিয়ে নেব। দ্বিতীয়ত, আমরা তাঁর দীর্ঘ জীবন কামনা করে চিৎ-শক্তি ধ্যান শুরু করেছিলাম। কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা প্রত্যেকদিন এই ধ্যান করেছিলাম।

যতই আমরা সমাপ্তির দিকে যাচ্ছিলাম, সদগুরু সর্বশেষ প্রান প্রতিষ্ঠা ঘটিত হবার দিনটি নির্দিষ্ট করে আমাদের বলছিলেন না, কারণ তিনি তাঁর নিজস্ব তন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। প্রথমে, তিনি বলেছিলেন এটা খুব তাড়াতাড়িই হবে, তারপর তিনি এটা বলতে শুরু করলেন, "ঠিক আছে, হয়তো বা কাল, হয়তো বা পরশু।" আমরা সেই দিনের অপেক্ষা করতে করতে আমাদের জীবনের সীমানায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ১৯৯৯ সালের ২৩শে জুন, সদগুরু বলেছিলেন যে প্রাণ-প্রতিষ্ঠাটি আগামীকাল হবে। তিনি আমাকে খুব অল্প কয়েকজন নিয়মনিষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবকদের আমন্ত্রণ জানাতে বলেছিলেন যারা এই প্রক্রিয়ার সমাপ্তি পর্বে তাঁকে বিরক্ত করবে না। সুতরাং মন্দিরে আমরা ১৫০-২০০ জন লোক ছিলাম।

এই প্রক্রিয়াকালে আমন্ত্রিত সাধকেরা লিঙ্গের দিকে পিছন ঘুরে এবং ব্রহ্মচারীরা লিঙ্গের দিকে মুখ করে বসেছিলেন। সদগুরু ’অভুদাইয়ার’ উপর ছিলেন। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া শেষের দিকে তিনি বলেছিলেন, "আজ্ঞা।" আমরা পূর্ববর্ণিত নির্দেশের পালন করলাম এবং প্রক্রিয়ার সাথে চললাম। তারপর তিনি বললেন, "বিশুদ্ধি," তারপর "অনাহত।" যখন তিনি "মনিপুরকা," বললেন, যেন ব্যথায় সামনের দিকে ঝুঁকে গেলেন। তারপর বললেন, "স্বাধিষ্ঠান" এবং তিনি তাঁর পায়ের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না। এটা দেখে আমি প্রায় ওঠার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমরা তাঁকে "মূলাধার" বলতে শুনলাম এবং তারপরই তাঁকে পড়ে যেতে দেখলাম। আমি সহজাতভাবে দৌড়ে গেলাম এবং ’অভুদাইয়ার’ পাথরের ওপর পড়ার আগেই আমি তাঁর মাথার নিচে হাত রাখলাম। ততক্ষনে অন্য ব্রহ্মচারীরাও আশেপাশে চলে এসেছিলেন।

আমরা তাঁকে তুলে নিয়ে একটি গাড়িতে বসলাম, তারপর তাঁর বাড়ি গেলাম এবং শুধুমাত্র স্বেচ্ছাসেবকদের আগমনের কারণে খুব সংক্ষিপ্ত একটি উপস্থিতি ছাড়া, পরবর্তী তিন দিন তাঁকে দেখলাম না। এমনকি তখনও তাঁকে ব্রহ্মচারীরা সাহায্য করছিলেন। তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভরসার আশায় আমি অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। তিন দিন পর আমি সেখানে যাবার এবং সদগুরুর সাথে দেখা করার একটি সংবাদ পেলাম। সেখানে তিনি তাঁর ইজি চেয়ারের ওপর বসেছিলেন, হাসছিলেন এবং তাঁকে অতি মহিমান্বিত দেখাচ্ছিলো। আমি তাঁকে ধরে কাঁদতে লাগলাম। তিনিও অশ্রুসিক্ত ছিলেন। সেই মুহূর্তে সবকিছুর পরিপূর্ণতার অনুভূত হচ্ছিল। তিনি সেখানে ছিলেন, আমাদের সাথে... জীবিত ।  

ঈশা বিকশিত হয়ে উঠতে শুরু করল

প্রাণ-প্রতিষ্ঠা সমাপ্ত হবার পর, সব কাজ বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে লাগল এবং আমরা সবাই একাধিক কাজ করছিলাম। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে রান্নাঘর হয়ে আশ্রম পরিচালনার কাজ, আমার নিজেস্ব কাজকর্ম বেড়েই চলেছিল। সদগুরুর একটি ব্যাপার এমন যে, তিনি সব কিছুর মধ্যেই এক উদযাপনী ভাব আনেন । সুতরাং যদিও আমরা দিনরাত কাজ করছিলাম, তবুও চারিদিকে উচ্ছ্বাসের প্রাচুর্য ছিল।

আমরা একসাথে প্রচুর মজা করেছিলাম যখন আমরা নিয়ম এবং পরিকাঠামোগুলি গড়ে তুলছিলাম । মনে পড়ে, স্বামী নিসর্গ এবং আমি স্পন্দ হলে একটি নতুন রান্নাঘর তৈরীর পরিকল্পনাটি করছিলাম। পরে আমি একটি চেত্তিয়ার পরিবারের সাথে কথা বলি এই রান্নাঘরের বাসনপত্রের ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য। এই সম্প্রদায় পণ হিসেবে (সোনা এবং হিরে ছাড়াও!) একটি পুরো দোকান ভর্তি বাসনপত্র দেবার জন্য বিখ্যাত। তারা তাদের পণ হিসেবে প্রাপ্ত জিনিসপত্র নামমাত্র মূল্যে আমাদের বিক্রি করার প্রস্তাব দিলেন। আমরা বেশ মজার সঙ্গেই, চামচ, বাটি, থালা, বড় হাতা, গ্লাস, বড় রান্নার পাত্র এবং রান্নাঘরের অন্যান্য জিনিস এই পণ সামগ্রী থেকে বেছে নিয়েছিলাম। একজন মহিলার বিয়ের পণ থেকে আমাদের পুরো রান্নাঘর সাজান হয়ে গেল!

আমরা একটি মাসিক অনুষ্ঠান স্থির করেছিলাম। মাসে একদিন আমরা প্রত্যেকে রান্নাঘরে আসবো- কেউ রান্না করবে, কেউ সাহায্য করবে এবং কেউ খেলাচ্ছলে বিরক্ত করবে। এই দিন আমরা একসাথে বাগানে ভোজন করতাম এবং আশ্রমে থাকলে সদগুরুও আমাদের সাথে যোগ দিতেন। একবার তিনি বলেছিলেন এই প্রথাটিকে জারি রাখতে এবং এটা পূর্ণিমার দিন করতে- সব আলো নিভিয়ে চাঁদের আলোয় খাওয়া। এইভাবে আমাদের অতি প্রিয় "জ্যোৎস্না রাতের ভোজন বা মুনলাইট ডিনার" শুরু হয়।

একটি অপ্রত্যাশিত উন্মোচন

পরের বছরগুলিতে যখন ঈশা যাত্রাা আমার প্রাথমিক দায়িত্ব হয়ে উঠল, সদগুরু আমাকে দেখাশোনা করতে বললেন যে যদি আমরা সাধকদের তিব্বতের কৈলাস মানসরোবরে নিয়ে যেতে পারি। সুতরাং ২০০৬ সালে আমরা প্রথম ১৬০ জন সাধককে এই পবিত্র যাত্রার সঙ্গী করলাম। আমি প্রস্তুতির কাজেই ব্যস্ত ছিলাম এবং একবারের জন্যও আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গে কৈলাস এবং মানসরোবরের কথা ভাবিনি। এটা কেবলমাত্র এমন একটা কাজ ছিল যেটাকে ভালোভাবে সম্পন্ন করতে হতো।

যখন সদগুরুর জিপটি একটি জায়গায় এসে থামল, এবং আমি তাঁকে বের হতে দেখলাম, আমিও আমার গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। আমার গাড়িটি তাঁর গাড়ির পেছনে ছিল। সেখান থেকে সোজা সামনের দিকে একটি অনেক বড় জলাশয় ছিল। আমি জলাশয়টির দিকে তাকাতেই আমার মধ্যে কিছু পরিবর্তন হলো। আমার চোখগুলো জলে ভিজে উঠলো। সেই সময় পর্যন্ত আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি যে আমি এইরকম একটি শক্তিশালী স্থানে তীর্থযাত্রায় যাচ্ছি- সবটাই বন্দোবস্ত করার ব্যাপারেই ছিল । আমি সদগুরুর দিকে ঘুরলাম, এবং তিনিও অশ্রুসিক্ত ছিলেন। তখন থেকে প্রত্যেক বছর কৈলাস মানসরোবর যাত্রার আয়োজন করা আমার জীবনের একটি অখন্ড অংশ হয়ে উঠেছে। যদিও বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শত শত সাধকদের চীনের এক ফসলহীন উচ্চতার স্থানে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার জন্যে অসম্ভব রকমের পরিচালনার প্রয়োজন পরে , তবুও এই দায়িত্ব পেয়ে আমি অকপটে নিজেকে ভাগ্যবতী এবং আশীর্বাদ প্রাপ্তা বলে মনে করি।

বেদনার স্বর্গীয় আনন্দ

২০০৯ সালে যাত্রার সময় কিছু খুব অন্যরকম অনুভব হয়েছিল আমার।

কৈলাসের ওপরের দিকে যাবার সময় আমি একটি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম, যেখানে আমার কব্জির বেশ কয়েকটি হাড় ভেঙ্গে গেছিল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের একজন ডাক্তার ১০ মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌঁছেছিলেন এবং সাময়িকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। যদিও ব্যথাটা তখনও অসহ্য ছিল। তারা আমাকে কয়েকটি ইনজেকশন এবং ব্যথা কমার ওষুধ দিলেন, কিন্তু কিছুই কাজ করেনি। সেই ব্যথা আমাকে ঘুমাতে দেয়নি। আমি কিছু বালিশের সহায়তা নিয়ে বসেছিলাম, আমার জানালা থেকে কৈলাস দেখা যাচ্ছিল এবং আমার রুমমেট আমার পাশে ঘুমাচ্ছিলেন। একটা সময় দেখলাম আমি নিজের মধ্যে "শম্ভ" স্তব করছি এবং কিছুক্ষণেই একইভাবে "সদগুরু" স্তব করছি। স্তব করার অভিপ্রায় আমার ছিলনা, কিন্তু এটা অনবরত হচ্ছিল। তাছাড়া আমি এটাও জানতাম না যে আমরা এভাবে "সদগুরু" স্তব করতে পারি! ধীরে ধীরে আমি উপলব্ধি করলাম ব্যথা এবং আমার মধ্যে একটি দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সেই যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা তখনো সেখানে ছিল, কিন্তু তখন, আমি ব্যথায় ছিলাম না।

যখন আমি ওই বছর কৈলাশ থেকে ফিরে এলাম, আমি জানতাম কিছু মৌলিক পরিবর্তন আমার মধ্যে হয়েছে। "কিন্তু সেটা কি?" আমি বিস্মিত হই। কিছুদিন পর আমি উপলব্ধি করলাম যে, যতদিন থেকে আমি নিজেকে জানি, শৈশবকাল থেকে, আমি যতই খুশি থাকি না কেন, আমার মধ্যে সব সময় একটি অব্যক্ত দুঃখ ছিল - সেই ব্যথাটাই চলে গেছে।

আর এক সময়, যখন একটু মনমরা লাগছিল, আমি সাধারনভাবেই বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম শিবপাদম- এর দিকে। হাটার সময়, আমার গায়ে বয়ে যাওয়া মৃদু হাওয়া আমি অনুভব করছিলাম, এক ধরনের শান্তি যেন আমার ওপর ঘনিয়ে এলো। আমি কিছুটা ধির গতিতে চলতে লাগলাম এবং পাহারের দিকে চেয়ে দেখলাম । আমি অনুভব করলাম এক সর্বব্যাপী একাত্মতা আমার মধ্যে ছেয়ে যাচিল। আকাশ, পাহাড়, বাতাস, গাছ এবং চারিদিকের সমস্ত জীবন আমার মধ্যে একত্ব অনুভূত হল। এই ভাব কিছু মুহূর্তের জন্য স্থায়ী ছিল। তারপর থেকে অনেকদিন আমি খালি পায়ে হাঁটতাম, কারণ মাটির স্পর্শের সাথে আমি একাত্ম বোধ করতাম, এবং আমার মধ্যে এক নিস্তব্ধতার অনুভুতি বোধ করতাম।

আমার সবথেকে আনন্দদায়ক এবং রূপান্তরকারী মুহূর্তগুলো তখনই ঘটেছে যখন আমি সেগুলোর সবথেকে কম আশা করেছি।

ঈশ্বরের ঈর্ষা

প্রথম দিকের ছোট এক খন্ড জমির ওপর সামান্য আরম্ভ থেকে শুরু করে, আমরা এমন একটি সময়ের স্বপ্ন দেখতাম যখন সমস্ত পৃথিবী সদগুরুকে চিনবে তিনি কে তার জন্য। পরিশেষে এরকম ঘটতে দেখা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ব্যাপার। আশ্রমের জন্য জমি খোঁজ করা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তাঁকে সঙ্গ দেওয়া, এই সফরে শেষ পর্যন্ত চলতে থাকা আমার সৌভাগ্য। সদগুরু একবার বলেছিলেন যে আমাদের এমন একটি স্থান তৈরি করতে হবে যা ঈশ্বরও ঈর্ষা করবে। উত্তমরূপে, আমি এমন একজনের সঙ্গে থাকি যিনি সেটা তৈরি করেন।