সদগুরুর মুখ থেকে অলৌকিক সুফি সাধক মনসুর অল-হল্লাজের কাহিনি

সদগুরু এখানে প্রথম দিকের এক সুফি সাধক মনসুর অল-হল্লাজের কাহিনি শোনাচ্ছেন, যাঁকে নিষ্ঠূর নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল শুধু “অনাল হক” কথাটি বলার জন্য, যার অর্থ হল “আমিই ঈশ্বর, আমিই সেই চূড়ান্ত সত্য।”
সদগুরুর মুখ থেকে অলৌকিক সুফি সাধক মনসুর অল-হল্লাজের কাহিনি
 

সদগুরু: মানবাত্মার অন্তর্লোকের সন্ধান প্রসঙ্গে, যুগ যুগ ধরেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক মতগুলোয় ভক্তির কথাই বলা হয়েছে। ভক্তি হল দ্রুততম পথ, কেননা বেশির ভাগ মানুষের কাছেই তাঁদের অন্তর্জগতের গভীরতম অভিজ্ঞতাটিই হল আবেগ।

এমনকী আজও, মানুষ যদিও এখন নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলেই ভাবেন, তবুও তাঁদের মধ্যে আবেগই সবচেয়ে তীব্র অনুভবের বিষয়। যদিও বেশির ভাগ মানুষই তাঁদের শরীর-কাঠামোতে তীব্রতা কাকে বলে, জানেন না। কয়েকজন হয়তো বা মনের তীব্রতাটুকু জানেন। কিন্তু খুব কম মানুষই তাঁদের প্রাণশক্তির তীব্রতাকে চিনতে পারেন। কিন্তু ওই যে, সকলেই তাঁদের আবেগের তীব্রতাকে জানেন। এমনকী তাঁদের প্রেম বা সহমর্মিতা যদি তীব্র নাও হয়, তবুও তো অন্তত রাগের সময়ে তীব্রতাটুকু থাকে। শুধুমাত্র আবেগ সম্বল করেই তাই তাঁরা বেশ তীব্র হতে পারেন। এজন্যেই ভক্তি ব্যাপারটার ওপরে এত বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।  

মানুষেরা যখনই কোনও আধ্যাত্মিক উন্মাদনা দেখিয়েছেন, সমাজ চিরদিনই তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

ভারতে ভক্তি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল এই উপমহাদেশের এক কোণ থেকে আরেক কোণে। এর বহু সুন্দর সুন্দর উদাহরণ রয়েছে—যেমন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, আক্কা মহাদেবী কিংবা মীরাবাঈ—এঁরা সবাই নিজেদের প্রাণের মাঝে আবেগের জোয়ার তুলে, বহু ওপরে উঠতে পেরেছিলেন।  

অন্যান্য সভ্যতা থেকেও এমনই আরও অনেকে এই উপমহাদেশে এসেছিলেন এখানকার এইসব কর্মকাণ্ডের আকর্ষণে। প্রথম দিকের সুফি সাধক মনসুর অল হল্লাজ তারই এক উদাহরণ। মোটামুটিভাবে দশম শতকে পারস্যের অধিবাসী ছিলেন তিনি। আপন যাত্রাপথে ভারতের গুজরাত অঞ্চলে এসে তিনি বহুকাল সেখানে কাটান একজন গুরুর কাছে। ভক্তি আন্দোলনের বেশ কয়েকজন বিশুদ্ধ যোগীর সান্নিধ্যে এসেছিলেন তিনি, যাঁরা একেবারেই অন্য রকম এক ঈশ্বরসুখে মগ্ন থাকতেন। এর পর সেখান থেকে তিনি চলে যান পাঞ্জাব প্রদেশে, যেখানে তাঁর সঙ্গে সম্ভবত অমনই আরও অনেক যোগীর সাক্ষাৎ ঘটে। 

এরপর মনসুর যখন অবশেষে পারস্যে ফিরে যান, তিনি তাঁর এই অভিজ্ঞতার কথা সবাইকে জানাতে চাইছিলেন। তাঁর পরনে তখন শুধু একটিমাত্র কটিবন্ধের ছোট্ট কাপড়—হুবহু ভারতীয় যোগীরা যেমনটা পরেন! আর তিনি একটি শব্দই উচ্চারণ করলেন, “অনাল হক”। সংস্কৃত ভাষায় যার অর্থ, “অহম ব্রহ্মাস্মি”—“আমিই ঈশ্বর, আমিই সেই চূড়ান্ত সত্য।”  

মানুষ ভাবল, তিনি উন্মাদ হয়ে গেছেন—একে তো ওই কটিবন্ধ পোশাক, তার ওপর নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করা। কিন্তু তিনি তখন ভাবোন্মত্ততায় আর থামছেন না। পথের ওপরেই পাগলের মতো নাচছেন আর গাইছেন।

এরপর পারস্য থেকে সটান মক্কায় গিয়ে নিজেরই এক দেবমূর্তি গড়েন তিনি—সম্ভবত কোনও ভাবে প্রাণপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সেটিকে। কিন্তু ওভাবে তো কারও বাঁচতে পারার কথা নয়, তাই তাঁকেও অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

অত্যাচারের অঙ্গ হিসেবে জীবন্ত অবস্থাতেই তাঁর শরীরের চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয় এবং তার পর তাঁকে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়। এবং সেখানেও শেষ না করে হুকুম দেওয়া হয়, ওই রাস্তার পথচারীদের সবাইকেই একটা করে ঢিল বা পাথর ছুঁড়তে হবে ওঁর গায়ে। মনসুরের প্রিয় বন্ধু শেবলি তখন ওই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলেন এবং হুকুম মাফিক তাঁরও কিছু ছোঁড়ার কথা। কিন্তু পাথর ছোঁড়ার মতো হৃদয় তো তাঁর নয়, তাই তিনি বন্ধুর দিকে একটি ফুল ছুঁড়ে দেন।

কিন্তু শেবলি ফুল ছোঁড়ামাত্রই তখনও জীবিত মনসুর আক্ষেপে ফেটে পড়ে কবিতার ভাষায় বললেন, “ওই সব পাথর আমায় ব্যথা দেয়নি, কারণ ওগুলো তো মূর্খদেরই ছোঁড়া। তবু তুমি যখন ফুল ছুঁড়লে, তা আমাকে দারুণ ব্যথা দিল, কেননা তুমি যে সব জেনেও কিছু ছুঁড়লে আমার দিকে।”

মানুষেরা যখনই কোনও আধ্যাত্মিক উন্মাদনা দেখিয়েছেন, সমাজ চিরদিনই তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। সমাজ আসলে বরাবরই ভক্তদের নিয়ে আশঙ্কিত, কেননা তাঁরা কোনও প্রচলিত যুক্তি মেনে চলেন না। নিজস্ব তাগিদেই যাঁরা নিজেদের উৎসর্গ করেন, তাঁরা খুবই সুন্দর মানুষ হলেও কোনও সামাজিক মাপেই মানানসই নন। কারণ ভক্ত হতে গেলে প্রাণে যে এক বিশাল মাপের উন্মাদনার প্রয়োজন। আর দারুণ সুন্দর উন্মাদনাও তো এক দিক থেকে পাগলামিই বটে।

যদি আপনার মনের লাগামই হারিয়ে যায়, তবে তো আপনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিকই থাকবেন এবং ফের এক মনসুর হয়ে উঠবেন—যে অবস্থাটা কিনা বেশির ভাগ মানুষেরই বোধবুদ্ধির বাইরে।

আসলে উন্মাদনা যদি না ঘটে, তবে তো নতুন কিছুই ঘটতে পারে না। তাই নতুন কিছু ঘটাতে চাইলে যুক্তিমাপা চিন্তাভাবনাকে বাদ দিতে হবে। এর মানে কি আপনাদের পাগল হতে হবে ? না ! সাধারণত আমরা যাকে পাগলামো বলি, তা হল অস্বাভাবিকতা। কিন্তু যুক্তিমাপা চিন্তা বাদ পড়ার কারণেই অস্বাভাবিকতা আসে না। কেননা যুক্তি তখনও রয়ে যায়, কিন্তু তা হয়ে ওঠে অকারণ কিছু। একজন অস্বাভাবিক মানুষ ভাবেন যে, তাঁর যুক্তিই সঠিক। যতদূর তাঁর মনে হয়, তিনি নন, বরং অন্যরাই অযৌক্তিক। তাই তিনি অন্য কারও কথা শোনেনই না। আর যখনই আপনি একবার ভাবতে শুরু করেন, “ সকলেই বেঠিক, একমাত্র আমিই সঠিক ”, ওটাই হল অস্বাভাবিকতার প্রথম লক্ষণ।  

অস্বাভাবিকতাও কিন্তু যুক্তির বাইরে নয়, বরং ওটা হল একটু ঘোরালো যুক্তি। একমাত্র আলোকিত হওয়ার অবস্থাই সব যুক্তির বাইরে—তাতে একটুও যুক্তিবুদ্ধি নেই। আর যখনই অমন শূন্য অবস্থা, তখনই সব কিছু আপনার মাঝে বইতে থাকে। সব কিছুই চলে আসে আপনার নাগালের মধ্যে।

 

সাধারণত কাউকে অস্বাভাবিক বোঝাতেই ইংরেজিতে একটা কথা বলা হয়—এর মনের লাগাম হারিযেছে। কিন্তু আপনার মনের লাগামই যদি হারাত, আপনি উন্মাদ হতেন কীভাবে ? অস্বাভাবিকতা সব সময়েই মনের ব্যাপার। আপনার মনের লাগাম থাকলে তবেই আপনি অস্বাভাবিক হতে পারেন। আর যদি আপনার মনের লাগামই হারিয়ে যায়, তবে তো আপনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিকই থাকবেন এবং ফের এক মনসুর হয়ে উঠবেন—যে অবস্থাটা কিনা বেশির ভাগ মানুষেরই বোধবুদ্ধির বাইরে। 

সেক্ষেত্রে আপনার চারপাশের মানুষজন যখন বুঝবে না যে আপনি কী করছেন, সমাজে ফের অমন নির্মম হত্যাকাণ্ডই ঘটবে। আপনার মন, আবেগ বা শরীরকে যদি আপনি কোনও রকম উন্মাদনার মধ্যে রাখেন, সেই মুহূর্তেই আপনি সামাজিকভাবে বেমানান হয়ে পড়বেন। এ জন্যই প্রাণশক্তিকে সবচেয়ে জোরালো করে রাখাটাই হল সবথেকে বেশি জরুরি। প্রাণশক্তির গুরুত্ব এখানেই যে, তার কোনও সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার নেই। তাই যে কোনও ধরনের উন্মাদনার মধ্যেই আপনার প্রাণশক্তি থাকুক না কেন, তখনও আপনার মন, আবেগ বা শরীরকে আপনি সামাজিকভাবে দিব্যি মানানসই করেই রাখতে পারবেন।

সুতরাং যাকে স্বাভাবিক বলে মানা হয়, তার সীমা যদি পেরিয়েও যেতে হয় আপনাকে, এবং একই সঙ্গে থাকতে হয় সামাজিকভাবে মানানসই হয়ে, সেক্ষেত্রে দারুণ জরুরি হল—শরীর, মন, আবেগ ও প্রাণশক্তির উন্নতি ঘটানো। কেননা একমাত্র তখনই আপনি চরম ও উন্মাদ অবস্থায় স্বর্গীয় সুখলাভের সঙ্গেই আর-পাঁচজনের মতোই একই দক্ষতায় সমাজের সমস্ত কাজই নিখুঁতভাবে করতে পারবেন—আজকের পৃথিবীতে যা কিনা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

আপনার প্রাণশক্তি উন্মত্ত হয়ে উঠলেও আপনার মন যদি স্থির থাকে, তখন ভিতরের জগতে আপনি সম্পূর্ণ মাতাল ও উন্মত্ত হবেন ঠিকই, কিন্তু বাইরের জগতে থাকবেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সুন্দর। আজকের দুনিয়ায় আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার এটাই সবচেয়ে নিরাপদ রাস্তা। 

সম্পাদকের মন্তব্য : এদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রেখেই সদগুরুর তীক্ষ্ণ সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, কেন এই সভ্যতা আজও পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই জানার বিষয়। আলোকচিত্র, গ্রাফিকস এবং সদগুরুর প্রেরণাদায়ী নানা উপদেশ সমেত এই হল সেই ভারত—যাকে এভাবে কখনও জানেননি আপনারা। ডাউনলোড করুন Download Bha-ra-ta.

 

 
 
  0 Comments
 
 
Login / to join the conversation1